২০ দিন ধরে চোখের সামনে দখল হাসপাতালের পুকুর!
- সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরেও ঠেকানো গেল না দখলদারদের
- ১০ কোটির জমিটি দখলের অভিযোগ বিএনপি-যুবদল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশাল নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বক্ষব্যাধি (টিবি) হাসপাতালের পেছনের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিত্যক্ত জলাশয় বালু ফেলে দখলের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে রাতের আঁধারে ওই জলাশয় ভরাট করে একটি প্রভাবশালী মহল দখলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলাশয়টি তাদের সরকারি সম্পত্তির অংশ। এ ঘটনায় গত ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে সিভিল সার্জন, বরিশাল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও জেলা প্রশাসককে।
এদিকে সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দখলদারদের বিরুদ্ধে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা ভূমি অফিস। অন্যদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) বালু ভরাটকারীদের নোটিস দিয়েছে এবং ঘটনাস্থলে টানিয়েছে বালু ভরাট নিষিদ্ধের সাইনবোর্ড।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে, টিবি হাসপাতালের পেছনের জলাশয়ের বড় একটি অংশ বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। ভরাট করা জায়গার পাশে বানী মন্দির স্কুলের সামনে টিনের বেড়া দেওয়া হয়েছে। এর পাশেই রয়েছে টিবি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল।
স্থানীয়দের দাবি, অর্ধশত বছর ধরে তারা জলাশয়টি টিবি হাসপাতালের সরকারি সম্পত্তি হিসেবে জেনে আসছেন। কিন্তু কয়েকদিন ধরে রাতের আঁধারে বিএনপির লোকজন এটি ভরাট করে বেড়া দিয়ে দখল করে নিলেও কেউ বাধা দেয়নি।
মুন্সীবাড়ির বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলছিলেন, ‘৫০ বছর ধরে জেনে এসেছি, এই পতিত জলাশয় টিবি হাসপাতালের। এখন শুনছি কয়েকজন নাকি জমিটি কিনেছেন।’ প্রায় ২০ দিন ধরে এখানে বালু ফেলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জলাশয় ভরাটের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার মো. জুয়েল।
টিবি হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম উল্লেখ করলেন, টিবি হাসপাতালের মোট ৭ একর ৪১ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে দাগ নম্বর ১০৬৯ (ভিটা), ১০৭০ (পুকুর) ও ১০৭১ (পুকুর)। খতিয়ান নম্বর ৪৮। পর্চায় এই জমির মালিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টর উল্লেখ রয়েছে। ‘আমরা থানায় ও এসিল্যান্ড অফিসে গিয়েছি। কিন্তু জমিটি বেহাত হওয়া ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। চোখের সামনে হাসপাতালের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে’— যোগ করলেন তিনি।
হাসপাতাল সংলগ্ন এই জমি সরকারের জানিয়ে টিবি হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মাসুমা আক্তারের অভিযোগ, ‘হাসপাতালের পুরনো স্টাফরাও জানেন এটি সরকারি জায়গা। অথচ রাতের আঁধারে টিবি হাসপাতালের পরিত্যক্ত জলাশয়টি ভরাট করা হচ্ছে।’
গত ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সিভিল সার্জন, এসিল্যান্ড ও ডিসিকেও জানানো হয়েছে। এসিল্যান্ড জানিয়েছিলেন, জমিটির চারপাশে বেড়া দেওয়া হবে। কিন্তু গত সোমবার রাতেই একদল দখলদার গাছপালা কেটে টিনের বেড়া দিয়ে জায়গাটি ঘিরে ফেলে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি’, বলছিলেন তিনি।
অন্যদিকে, জলাশয়টির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দাবি করে রাকিবুল ইসলাম লিয়ন জানালেন, ৬৯ শতাংশের এই জমির মালিক স্থানীয় হেলাল আকন ও তার বোন। তাদের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছেন চারজন। তারা হলেন ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব বাবুল তালুকদার, মো. আলমগীর, রাকিবুল ইসলাম লিয়নসহ আরও একজন।
তবে ওই জমির মালিকানা নিয়ে সরকারি নথির সঙ্গে তাদের দাবির অসংগতি রয়েছে বলে দাবি ভূমি অফিসের। বরিশাল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বললেন, ‘টিবি হাসপাতালের পাশের ওই জমিটি একটি দুষ্টচক্র ঘিরে ফেলেছে। তারা বেড়া দেওয়ার আগেই জায়গাটি টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। বিএস রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দেখানো হয়েছে। তারা যে কাগজই দেখাক না কেন, যেহেতু এটি সরকারি খাস খতিয়ানের জমি, সেহেতু তারা জমিটি নিতে পারবে না।’
এ জমি তাদের কাছে কীভাবে গেল, সেটি চ্যালেঞ্জ করে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে বলেও জানালেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘আমি নিশ্চিত, ১০ থেকে ১৫ বছর আগে জরিপের সময় টাকাপয়সা দিয়ে এটি এসএ খতিয়ানে তোলা হয়েছে। জমিটি যাতে কোনোভাবে বিক্রি বা দলিল করতে না পারে, সেজন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলছিলেন, ‘আমি জানি, ওই জমি কেনাবেচা হয়ে গেছে। তারা মালিকের কাছ থেকে পাওয়ার নিয়েছে। এখানে জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা ভূমি অফিস বলতে পারবে।’
জানা গেল, ভরাট করা জমির প্রতি শতাংশের বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে ৭০ শতাংশ জমির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বললেন, ‘হাসপাতালের এত বড় একটি জমি ১৫ দিন ধরে দখল করা হলো, অথচ এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসন তাহলে কী করল? এখন মামলা হলে এটি উদ্ধার করতে অনেক সময় লাগবে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে যা যা করার দরকার, আমি তাই করব।’ এদিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার।




