শেরপুর
বিবাহিত বনাম অবিবাহিতদের হাডুডু লড়াই, শেরপুরে ঈদের আনন্দ

ছবি: আগামীর সময়
মাঠে তখন টানটান উত্তেজনা। এক পক্ষের খেলোয়াড় দম বন্ধ করে ‘কাবাডি কাবাডি’ বা ‘হাডুডু’ ডাক দিয়ে প্রতিপক্ষের সীমানায় ঢুকতেই গ্যালারি জুড়ে পিনপতন নীরবতা। যেই না চতুরতার সাথে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে ছুঁয়ে নিজের সীমানায় ফিরে এলেন, অমনি পুরো মাঠ ফেটে পড়ল করতালির জোয়ারে আর হইহুল্লোড়ে। পয়েন্ট পাওয়ার পর সমর্থকদের সেই বাঁধভাঙা উল্লাস যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল শৈশবের চেনা সোনালী দিনগুলোর কথা।
ক্রিকেট আর ফুটবলের দাপটে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলাই এবার বাড়তি রঙ জোগাল শেরপুরবাসীর ঈদের আনন্দে। শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে শেরপুর সদরের টাঙ্গারিয়া পাড়া কামারবাড়ী মাঠে বসেছিল ঐতিহ্য আর উৎসবের এই মিলনমেলা। স্থানীয় ‘মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ গ্রামীণ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর পরিচিতি তুলে ধরতে এই বিশেষ ম্যাচের আয়োজন করে।
এবারের লড়াইটা ছিল বেশ জমে ক্ষীর; একদিকে অভিজ্ঞ ‘বিবাহিত হাডুডু দল’, অন্যদিকে চিরতরুণ ‘অবিবাহিত হাডুডু দল’। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উপভোগ্য এই খেলায় অবিবাহিত দলকে ২-১ গেইমে পরাজিত করে শেষ হাসি হাসে বিবাহিত দল। মাঠের এই জমজমাট লড়াই দেখতে টাঙ্গারিয়া পাড়ার ছাত্র, যুবক থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক-কৃষাণীদের ঢল নেমেছিল। সব শ্রেণী-পেশার হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে কামারবাড়ী মাঠ পরিণত হয়েছিল এক টুকরো আনন্দ দ্বীপে। খেলাটিতে অংশ নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দুই দলের খেলোয়াড়েরাই।
স্থানীয়রা জানান, এক সময় শেরপুর জেলার গ্রামগঞ্জে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল হাডুডু। মাঠজুড়ে প্রায়ই হতো এর আয়োজন। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন খেলার মাঠগুলো ক্রিকেট আর ফুটবলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, যার কারণে এই দেশীয় খেলাটি বিলুপ্তির পথে। তবে হাডুডুর প্রতি মানুষের ভালোবাসা যে এতটুকুও কমেনি, মাঠে উপচে পড়া ভিড়ই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
সাধারণত প্রতি বছর ‘সাংবাদিক হয়নূল আবেদীন স্মৃতি সংসদ’ এই হাডুডু খেলার আয়োজন করলেও, এবার সেই হাল ধরেছে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘মানব কল্যাণ ফাউন্ডেশন’। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম আশ্বাস দিয়ে বললেন, 'হাডুডু খেলা দেখে মানুষ যেমন অনাবিল আনন্দ পায়, তেমনি নতুন প্রজন্মও আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। তাই তরুণদের আকৃষ্ট করতে প্রতি বছরই আমরা এই হাডুডু খেলার আয়োজন ধরে রাখব।'
বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সমাজসেবক এস এম শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই আনন্দঘন আয়োজনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চরাঞ্চল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি এম এ রশীদ বিএসসি, সাধারণ সম্পাদক মো: মেরাজ উদ্দিন, জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আক্রামুজ্জামান রাহাত, চাকরিজীবী মো. পারভেজ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইউসুফ আলী, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, দেলোয়ার হোসেন এবং বজলুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
খেলা শেষে করতালির মধ্য দিয়ে বিজয়ী ও বিজিত—উভয় দলের খেলোয়াড়দের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। তবে শুধু স্থানীয়দের একক প্রচেষ্টায় নয়, কৃষক, শিশু-কিশোর ও যুবকদের প্রাণের এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারি বড় উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় হাডুডুপ্রেমীরা।






