‘আওয়ামী দোসর’ আখ্যা দিয়ে রামেবি ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ

ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. জাওয়াদুল হকের কক্ষে ঢুকে তাকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে ‘মব’ সৃষ্টির মাধ্যমে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন উপাচার্য।
এসময় উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) নাজমুল ইসলামকেও মারধর করে তাকেও জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে ইস্তফা করানো হয়। পরে তাদের দুজনের মোবাইল ফোন ও উপাচার্যের ল্যাপটপ জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেওয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, খুলে নিয়ে যাওয়া হয় সিসিটিভি ব্যবস্থার সিপিইউ ও হার্ডডিস্ক। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা। ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে কয়েকটি কক্ষে তালাও। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।
পরে মঙ্গলবার বিকালে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী রেস্টহাউজে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ‘মব’ তৈরি করে পদত্যাগের বিষয়টি জানান।
এসময় উপাচার্য বলেছেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দায়িত্ব শিক্ষা, গবেষণা এবং সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, আজ ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি মব তৈরি করে বেআইনিভাবে আমার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। তারা আমাকে এবং আমার একান্ত সচিবকে অবরুদ্ধ করেন। এ সময় আমার একান্ত সচিবসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর হামলা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
শুধু হামলা বা অবরুদ্ধ করেই তারা থেমে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার কার্যালয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসংবলিত কম্পিউটারের সিপিইউও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর আমাকে জিম্মি করে প্রাণনাশের হুমকি এবং শারীরিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। ভয়ভীতি প্রদর্শন, জিম্মি করা কিংবা শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নেওয়া কোনো পদত্যাগপত্রকে স্বেচ্ছায় দেওয়া পদত্যাগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কখনোই ভয়, সহিংসতা কিংবা মবের চাপের মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে না। ঘটনার পরপরই বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিত করেছি। আশা করছি, তারা দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি— জোরপূর্বক নেওয়া পদত্যাগপত্রের বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি হার্ডডিস্ক ও কম্পিউটার দ্রুত উদ্ধার করে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণ করতে হবে। হামলা, জিম্মি করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি মবের শক্তি আইন ও বিধিবিধানের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীর আপামর ছাত্র-জনতার ব্যানারে একদল লোক ভিসির কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ভিসির দপ্তরে প্রবেশ করে তাকে চেয়ার ছেড়ে দিতে বলে। এসময় তারা একটি পদত্যাগপত্রে তাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে তার দপ্তর থেকে বের করে দিয়ে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এর আগে ভিসির ব্যক্তিগত সহকারী নাজমুল প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে তার ওপর হামলা চালিয়ে তাকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি গ্রহণের একটি পত্রে মব সৃষ্টি করে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয়।
জানতে চাইলে ভুক্তভোগী নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘একদল লোক হঠাৎ ভিসি স্যারের দপ্তরে প্রবেশ করে। আমি তখন তার দপ্তরেই ছিলাম। তখন তারা ভিসি স্যারকে আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগ দিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করায়। আমার ওপর হামলা চালিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। পরে বিষয়টি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে লিখিতভাবে জানাই।’
তবে কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কর্মকর্তারা জানান, ওই ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, স্থানীয়দের বাদ দিয়ে ঢাকার লোকজনকে কাজ দেওয়া হচ্ছে।
তারা জানালেন, ঘটনাস্থলে ২০ থেকে ২৫ জনের মতো মানুষ ছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আগে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে দেখা গেছে। অনেককেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা আগে দেখেননি।
জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি নজরুল হুদা জানান, তিনি শুনেছেন, নিয়োগ নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় বিএনপির কিছু কর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে গিয়ে উপাচার্যকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিষয়টি জানিয়েছেন। তারা কারা সেখানে গিয়েছিল তা জানা নেই বলেও জানান বিএনপির এই নেতা।



