আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নয়, নারায়ণগঞ্জে নেদারল্যান্ডস দলের ব্যতিক্রমী ভক্ত!

ছবি: আগামীর সময়
আর মাত্র কয়েকদিন পরেই পর্দা উঠছে ফুটবল বিশ্বকাপের। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মতো বাংলাদেশেও শুরু হয়ে গেছে তুমুল উন্মাদনা। এ দেশে সাধারণত আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের সমর্থকদের জয়জয়কার দেখা গেলেও এবার নারায়ণগঞ্জে খোঁজ মিলেছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক ফুটবলপ্রেমীর। তিনি অন্য কোনো পরাশক্তি নয়, বরং নেদারল্যান্ডস (ডাচ) ফুটবল দলের এক নিবেদিতপ্রাণ সমর্থক। তার নাম মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা লস্কর। নিজের পুরো বাড়িটিকেই তিনি রূপ দিয়েছেন নেদারল্যান্ডস ফুটবল দলের এক জীবন্ত সংগ্রহশালায়।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম এনায়েতনগর লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল (এনএলসি) এলাকার ‘মায়াকানন’ নামের বাড়িতে বাস করেন ৪৬ বছর বয়সী বদরুদ্দোজা লস্কর। পেশায় তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। বর্তমানে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে কর্মরত।
ব্যস্ত চাকুরিজীবনের মাঝেও ডাচ ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসা যে কতটা গভীর, তা ‘মায়াকানন’-এ পা রাখলেই বোঝা যায়। ঘরের ভেতর ঢুকতেই চোখে পড়বে দেয়ালজুড়ে কমলা রঙের রাজত্ব। প্রিয় দলকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে তিনি সংগ্রহ করেছেন জার্সি, পতাকা ও নানা স্মারক। শুধু সংগ্রহেই ক্ষান্ত হননি, নিজের ঘরের মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে তৈরি করেছেন প্রায় ৮ ফুট বাই ১২ ফুটের একটি নিখুঁত ও আকর্ষণীয় ‘মিনি স্টেডিয়াম’। প্রথম দেখায় যে কারও মনে হতে পারে, এটি বাংলাদেশের কোনো ঘর নয়; বরং নেদারল্যান্ডসেরই কোনো ছোটখাটো ফুটবল জাদুঘর!
বদরুদ্দোজা লস্করের সঙ্গে কথা হয়। জানালেন, ২০১০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছরের চেষ্টায় তিনি এই সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন। ১৯৮৮ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস দলের প্রায় ৬০টি ভিন্ন ডিজাইনের মোট ৮০ থেকে ৮৫টি জার্সি ও টি-শার্ট রয়েছে তার সংগ্রহে।
তার সংগ্রহের সবচেয়ে অমূল্য রতনটি হলো ১৯৭৪ সালের ডাচ দলের একটি ঐতিহাসিক জার্সি। যেটি তিনি এক বন্ধুর মাধ্যমে ফ্রান্স থেকে আনিয়েছেন। এছাড়াও তার সংগ্রহে রয়েছে ডাচ লোগো সংবলিত কাপ, প্র্যাকটিস কিট, পানির বোতল, মগ, প্লেট, ফুটবল, চাবির রিং, এমনকি নেদারল্যান্ডস ফুটবল দলের থিমের তৈরি লুঙ্গিও!
ফুটবলের সঙ্গে তার সখ্যতা শৈশব থেকেই। বদরুদ্দোজা জানালেন, ১৯৮৮ সালে যখন নেদারল্যান্ডস ইউরো চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন থেকেই দলটির প্রতি তার মনে এক অন্যরকম গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়।
এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে ডাচ দলটির ওপর বেশ আত্মবিশ্বাসী এই সমর্থক। বর্তমান দলের শক্তিমত্তা নিয়ে বদরুদ্দোজা বলেছেন, ‘আমাদের রক্ষণভাগ এবার সবচেয়ে শক্তিশালী। ভার্জিল ভ্যান ডাইক, নাথান আকে, মিকি ভ্যান ডি ভেন, স্টেফান ডি ভ্রাই ও ডামফ্রিসদের মতো বিশ্বসেরা ডিফেন্ডাররা আছেন। মাঝমাঠে ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ং এবং আক্রমণে কডি গ্যাকপো, মেমফিস ডিপাই ও ভেগহর্স্টরা থাকায় এবার দল নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। আশা করি, আমরা ভালো কিছু করতে পারব।’
পেশাগত জীবনে সফল বদরুদ্দোজা লস্কর স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে চার সদস্যের এক সুখী পরিবারের প্রধান। তবে মজার ব্যাপার হলো, পুরো বাড়িতে তিনি একাই কেবল নেদারল্যান্ডসের সমর্থক। তার স্ত্রী ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত।
অন্যদিকে, তার ১০ বছর বয়সী বড় ছেলে আমির হামজা লস্কর এবং ৬ বছর বয়সী ছোট ছেলে সাদ আব্দুল্লাহ তায়েব দুজনেই জার্মানি দলের কট্টর সমর্থক।
বড় ছেলে আমির হামজা বলেছেন, ‘বাবা ছোটবেলা থেকেই আমাদের বিভিন্ন খেলা দেখিয়েছেন। তবে আমার জার্মানির খেলাই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।’
আর ছোট ছেলে সাদের ভাষ্য বেশ রসাত্মক। বললেন, ‘বাবার দলের কোনো বিশ্বকাপ নেই। কিন্তু জার্মানির চারটা বিশ্বকাপ আছে। তাই আমি জার্মানিকে ভালোবাসি।’
পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন দলের সমর্থক হলেও, তা কখনোই তাদের পারিবারিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। বরং ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে তাদের চার দেয়ালের মাঝে এখন চলছে দারুণ এক উৎসবের আমেজ। পারস্পরিক খোঁচাখুঁচি, আনন্দ আর খুনসুটিতে লস্কর পরিবারে ফুটবল যেন এক ভিন্ন রকম ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করেছে।
ফুটবলের আসল সৌন্দর্য যে কেবল মাঠের জয়-পরাজয়ে নয়, বরং এমন সুন্দর সম্প্রীতি ও নিখাদ আনন্দের মাঝে—তা এই ডাচ ভক্তের পরিবারটি আরও একবার প্রমাণ করে দিল।





