রোহিঙ্গাদের জন্য পাহাড় কেটে ঘর, স্থানীয়দের ক্ষোভ

পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে দোতলা ঘর। ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে শত শত দোতলা ঘর। এসব ঘর নির্মাণের ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
জানা গেছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব শেল্টার।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, এগুলো স্থায়ী অবকাঠামো নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার উদ্যোগ।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, কুতুপালং ক্যাম্পের ৪ নম্বর এক্সটেনশনের ‘ই’ ব্লকে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক। সমতল করা হচ্ছে আশপাশের টিলাও। সেখানে ইট, বালু ও লোহা ব্যবহার করে নির্মাণ করা হচ্ছে শত শত অস্থায়ী ধরনের শেল্টার। যার মধ্যে ৮৮৮টির কাজ এগিয়েছে অনেকটাই।
রোহিঙ্গা প্রতিরোধ ও প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির মহাসচিব এবং পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, উখিয়া-টেকনাফ এলাকায় ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গার চাপের মধ্যেই স্থানীয়রা বিপর্যস্ত। সেখানে এ ধরনের এমন অবকাঠামো নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তিনি অভিযোগ করেন, ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতায় রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করছে কিছু এনজিও। ‘সওয়াব’ নামের একটি এনজিও ইউএনএইচসিআরের অর্থায়নে দোতলা কাঠামো নির্মাণে যুক্ত বলে দাবি করেন গফুর উদ্দিন চৌধুরী।
তার আশঙ্কা, পাহাড় কেটে স্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হলে বাধাগ্রস্ত করবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পরিবেশও।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমে নির্মাণকাজের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর উখিয়া-টেকনাফজুড়ে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘সাধারণত বাঁশ ও ত্রিপলের অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হয় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেখানে ইট ও লোহার ব্যবহার স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।’
দ্রুত এই নির্মাণকাজ বন্ধে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা আমির মাওলানা নূর আহমেদ আনোয়ারী।
স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, ‘ঘর নির্মাণের ফলে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীকরণের পথ তৈরি হচ্ছে। যা দুঃখজনক।’
রাজাপালং ইউনিয়নের সদস্য হেলাল উদ্দিনের দাবি, ‘বর্ষার আগে পাহাড় কাটার কারণে ভূমিধসের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকেই চাপ বেড়েছে কক্সবাজারের বনভূমির ওপর। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানিয়েছেন, ‘এরইমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ বন বিভাগের বড় অংশ। নষ্ট হয়েছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। নতুন করে আবাসন নির্মাণ আরও হুমকি তৈরি করতে পারে পরিবেশের জন্য।’
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া ও টেকনাফে অন্তত আট হাজার একরের বেশি বনভূমি ব্যবহৃত হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্য। স্থানীয়দের দাবি, এই পরিমাণ ১২ হাজার একরেরও বেশি।
এদিকে কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন শেল্টারগুলো স্থায়ী নয়। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তৈরি করা হচ্ছে এসব ঘর। পাহাড় কাটার অভিযোগ তদন্তে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রমাণ মিললে নেওয়া হবে ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, শেল্টারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হচ্ছে যাতে সুরক্ষা পাওয়া যায় ঝড়-বৃষ্টি থেকে। প্রয়োজনে খুলে ফেলা সম্ভব সহজেই।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেছেন, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘টেকসই’ শেল্টার নির্মাণকে ঘিরে এখন দুই ধরনের অবস্থান স্পষ্ট। একদিকে মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের যুক্তি, অন্যদিকে স্থায়ী বসবাসের আশঙ্কা ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রশ্ন। তদন্তের ফলাফল ও সরকারের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। বর্তমানে কক্সবাজার, উখিয়া ও ভাসানচরের বসবাস করছে ৩৪টি ক্যাম্পে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা।




