মোদির পদ্মফুল ফোটালেন শুভেন্দু

সংগৃহীত ছবি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল! দুজনই অবিবাহিত, নিঃসঙ্গ। প্রথমজনের বয়স ৭১। দ্বিতীয়জন ৫৫ বছর।
আরও মজার ব্যাপার আছে। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সবাদী (সিপিআইএম) দলটির পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের রাজত্বের মুকুট ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল ২০১১ সালে। সেটা করেছিলেন দিদি মমতা ও শুভেন্দু মিলে। আর ১৫ বছর পর দিদিকে হাত ধুয়ে দিলেন প্রিয় ভাই শুভেন্দু। আহা, কী মধুর প্রতিশোধ!
প্রায় ১২৫ কোটি মানুষের ভারতে ২৩ রাজ্যে অসংখ্য ভাষাভাষী আর বৈচিত্র্যপূর্ণ আবহাওয়া। এক শহরেই কথা বলছেন কেউ হিন্দিতে, কেউ বাংলায়, কেউ ইংরেজিতে। দিল্লিতে উষ্ণ আবহাওয়া তো পাশের কাশ্মীর বরফ আচ্ছাদিত। ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাকে বলা হয় সাংস্কৃতিক রাজধানী। অনেক বছর পর সেই সাংস্কৃতিক রাজধানীর মানুষরাই দেখল বৈচিত্র্যপূর্ণ ও নাটকীয় এক ক্ষমতার পালাবদল। ক্ষমতার চেয়ার থেকে ‘মমতা আউট, শুভেন্দু ইন’।
রাজনৈতিক পরিবারেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা শুভেন্দুর। নন্দীগ্রামে বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গে কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে ছাত্ররাজনীতির দীক্ষা। বাবা দলবদল করে তৃণমূলের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাবার পর নন্দীগ্রামের হাল ধরেন শুভেন্দু। ২০১১ সালে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে মমতার সরকারের দু-দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতি ও ক্ষমতা- দুটোরই ভরসার জায়গায় শুভেন্দু ছিলেন মমতার টপ ওয়ান। দিদির এত মায়া, এত ভালোবাসা, এত আস্থা- তাও কোথায় যেন ঘুড়ির সুতোয় টান। গোত্তা খেতে থাকে ঘুড়ি, উড়বে না পড়বে? এরকম টানাপড়েনে সটকে পড়লেন শুভেন্দু ২০২০ সালে, বললেন বিদায় দিদি।
কেন এই ছন্দপতন, কেনইবা বিচ্ছেদ? জানতে চাইলাম কলকাতারই সব্যসাচী লেখক ও সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্যের কাছে। ‘মমতার পর কে? ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত দাপট আর আধিপত্যে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎটাই যেন দেখতে পেলেন শুভেন্দু। মানে দল, ক্ষমতা, দাপটে নাম্বার থ্রি থেকে যাবেন কেন আজীবন। এভাবে নিজের ভবিষ্যৎ আঁচ করতে পেরে দল ছাড়লেন।’
বিকল্প খুঁজলেন, পেলেনও। ২০২১ সালে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হয়ে জিতলেন। পশ্চিমবঙ্গে হাল ধরলেন বিজেপির।
২০২১ থেকে ২০২৬, পাঁচ বছরের রাজনীতির চাষাবাদ। ফলাফল দারুণ। টার্গেট ছিল ২৯৪ আসনের মধ্যে ১৭৭টি। পেলেন তার চেয়েও বেশি, ২০৭। ১৪৮ আসন সরকার গঠনের সাংবিধানিক ফিগার। ফলাফল এমনই ঘটল যে, বিজেপির বিজয়ে ম্যাজিক ফিগার- রাত ১০টায় ২০৮ আসন। শুধু ম্যাজিক ফিগার নয়, ম্যাজিক নিজেও দেখাতে জানেন শুভেন্দু। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে খোঁচা মেরে একসময়ের মমতাময়ী দিদিকে নন্দীগ্রাম থেকে পাঠালেন ভবানীপুর আসনে। দিদিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভবানীপুরেও হাজির শুভেন্দু। সেখানেও হেরে গেলেন মমতা। ১৫ হাজার ১১৪ ভোটে জয়ী শুভেন্দু।
ভোটের আগে ও পরে কলকাতার মানুষের ভাব দেখে বোঝার উপায় ছিল না, কে জিতবে। বুথফেরত জরিপেও ছিল বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল। না হয় ইন্টার্নাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ধীমান সেন কেনইবা তখন বলবেন, ‘বুঝলেন তো, কেউ কিছু মন্তব্য করছে না। সবাই নির্বিকার। আগের মতো ভোট হওয়ার কোনো চান্স দেখছি না। নির্বাচন কমিশনের এবার সাংঘাতিক নজরদারি।’
ফলাফলের দিন বিকালে কলকাতা থেকে হেরিটেজ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী গোপাল মাইতি জানালেন, অটল বিহারি বাজপেয়ি থেকে শুরু করে অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সফল হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। শেষ পর্যন্ত শুভেন্দুর হাতেই ফুটল মোদির তুলে দেওয়া বিজেপির পদ্মফুল।
শুভেন্দুর জন্ম ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদেনীপুরে। ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম মুভমেন্ট থেকেই রাজনীতিতে তার নায়ক হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ। পরের ধাপ সিনেমার সাসপেন্সে ভরা। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে লড়াইয়ে নামেন মমতার বিরুদ্ধে। হারিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে। ভারতের বাংলা হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আলোচনার ঝড়। হাইভোল্টেজ লড়াই, জয় হলো মমতার মন্ত্রিসভা ছেড়ে আসা শুভেন্দুর। সংসদে তিনি হন অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী দলের নেতা।
একের পর এক রাজনৈতিক কৌশলের জয়- কী সেই জাদু শুভেন্দুর। রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতা তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে সবসময়। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ও ব্যক্তিগত ক্যারিশমায় তিনি আজ বিজেপিতে সমুজ্জ্বল। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে।
মমতার আমলে গত ১৫ বছরে ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনতোষণ বিশেষ করে ভাইপো অভিষেকের অপ্রতিরোধ্য অনাচার মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আবার বিজেপিও এমন ফোকাস দিয়েছে পশ্চিম বাংলার ভোটে, যা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। কেন্দ্র থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার ফোর্স পাঠানো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিন দফায় কলকাতা সফর এবং বাংলায় বক্তৃতা দেওয়া ও ঝালমুড়ি খাওয়া। এরপর রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সাত দিন ধরে একনাগাড়ে কলকাতায় পড়ে থাকা। এসব অনেক কিছুর ইঙ্গিত।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এবার সর্বোচ্চ ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা গতবারের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি। ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ভোট শেষে এত ভোটার উপস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ করে কলকাতা টিভির প্রভাবশালী সাংবাদিক গৌতম ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘এত ভোট পড়ার কারণ মনে হয় এটাই যে, মানুষ নতুন কিছু বলতে চায়।’
বামপন্থীদের ৩৪ বছরের পর তৃণমূলের ১৫ বছর। এখন বিজেপি। আসলেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নতুন গল্প রচনা করেছে। মমতারই শিষ্য শুভেন্দু এবার নবান্নের দোরগোড়ায়। শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-নাটক- সব মিলিয়ে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতা।
এবার ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের বিস্তৃতি সেখানকার সামাজিক বিপত্তি ঘটাবে না ‘সিটি অব জয়’- মানে আনন্দের শহর হয়েই থাকবে কলকাতা?



