ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা শিশুটি এখন ঝুঁকিতে, ধরাছোঁয়ার বাইরে অভিযুক্ত শিক্ষক

শিশু ধর্ষণে অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ
মেয়েটির বয়স ১১। গর্ভে প্রায় ছয় মাসের সন্তান। খেলার বয়সে তার দিন কাটছে ভয়ে-শঙ্কায় আর নানা শারীরিক জটিলতায়। ছোট্ট শরীর সন্তান প্রসবের ধকল নিতে পারবে কি না, কোন পদ্ধতিতে তা হবে— এসব নিয়ে দুশ্চিন্তায় চিকিৎসকরা।
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় কাইটাইল ইউনিয়নে নানির বাড়িতে থাকে মেয়েটি। এলাকার মাদ্রাসায় পড়ত সে। একাধিকবার তাকে ধর্ষণ করেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর— উঠেছে এমন অভিযোগ। শারীরিক পরিবর্তন আসার পর বিষয়টি টের পায় শিশুর পরিবার। ততক্ষণে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পালিয়েছেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
মদন থানায় গত বৃহস্পতিবার ধর্ষণের মামলা করেছেন মেয়েটির মা। একমাত্র আসামি হজরত ফাতেমাতুজ জোহুরা মহিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক আমান উল্লাহ। সোমবার (৪ মে) তা নিশ্চিত করেছেন থানার ওসি তরিকুল ইসলাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে ওই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন আমান উল্লাহ। তার স্ত্রী সেখানকার প্রধান শিক্ষক। ভুক্তভোগী শিশুটি সেখানে পড়ছে তিন বছর ধরে। তার বাবা মারা গেছেন অনেকদিন আগে। বাড়িতে থাকে নানির কাছে। মা সিলেটে গৃহকর্মীর কাজ করেন।
এজাহারে অভিযোগ, গত বছরের নভেম্বরে শিক্ষক আমান উল্লাহ মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। ভয় দেখান প্রাণনাশের। অসুস্থ বোধ করায় পাঁচ মাস ধরে মাদ্রাসায় যায়নি শিশুটি। শারীরিক পরিবর্তনের খবরে সিলেট থেকে আসেন মা। এরপরই জানা যায় ধর্ষণের ঘটনা।
শিশুটিকে গত মাসে নেওয়া হয় স্থানীয় স্বদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। তাকে পরীক্ষা করেন গাইনি চিকিৎসক সায়মা আক্তার। ‘শিশুটি তার মায়ের সঙ্গে আমার ক্লিনিকে আসে। সে জানায়, তার পেট সবসময় ভারী অনুভব হয়, পেটের ভেতর কিছু একটা নড়াচড়া করছে বলে মনে হয়। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করে দেখি, শিশুটি তীব্র রক্তশূন্যতায় ভুগছে’— বললেন ডা. সায়মা।
আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে চিকিৎসক দেখেন, শিশুটি অন্তত ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
‘১১ বছরের মেয়েটির উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম। ওজন মাত্র ২৯ কেজি। গর্ভের সন্তানটির বাইপারিয়েটাল ডায়ামিটার (মাথার দুপাশের হাড়ের দূরত্ব) প্রায় ৭৪ মিলিমিটার। শিশুর পেলভিসের তুলনায় এটি অনেক বড়। এটি মা ও নবজাতক দুজনেরই বড় ধরনের শারীরিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে’— আশঙ্কা চিকিৎসকের।
‘এ ছাড়া শিশুর রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা মাত্র ৮ দশমিক ২, যা মারাত্মক রক্তস্বল্পতার লক্ষণ। সে অপুষ্টি এবং কৃমির সমস্যায়ও ভুগছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ডেলিভারি প্রায় অসম্ভব। শুধু ‘ক্র্যানিওটমি’ (গর্ভের শিশুর মাথার খুলি কেটে বের করা) পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাভাবিক ডেলিভারি করা যেতে পারে। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। ১১ বছরের এই শিশুর শরীরে সিজারিয়ান সেকশনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যানেস্থেশিয়া বা ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ’— যোগ করলেন ডা. সায়মা।
শিশুটি প্রচণ্ড আতঙ্কিত; এখনো বুঝতে পারছে না কী ঘটছে— বললেন তিনি।
এদিকে, ছুটি নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল থেকে পরিবারসমেত উধাও অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ। মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক মো. ছোটনের দাবি, প্রতিষ্ঠানের কেউ জানতেন না এ ঘটনা।
‘বলতে গেলে এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীর পরিবার কিছু জানায়নি। আর পাঁচ মাস আগে ওই মেয়ে চলে গেছে, তখনো আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তারা (শিক্ষক ও শিশু) দুই পরিবার প্রতিবেশী। অভিযুক্ত আমান উল্লাহ তো ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন না। তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ পলাতক। গ্রামের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন না।’
অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারে সব চেষ্টা চলছে— জানালেন মদন থানার ওসি তরিকুল।



