কলম্বাসের শেষ সমুদ্রযাত্রা
এশিয়ার স্বপ্নে ভেসে কোস্টারিকা আবিষ্কার
- ১৫০২ সালের এই দিনে কোস্টারিকা আবিষ্কার করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস

সংগৃহীত ছবি
১৫০০ শতকের এক সন্ধ্যা। অজানার প্রতি দিকনির্দেশনা দিচ্ছে যেন ইউরোপের আকাশের তারারা। বন্দরনগরীর কাছে দাঁড়িয়ে সমুদ্রে তাকিয়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তার চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না। বিশ্বাস ছিল, পশ্চিমের পথের শেষেই লুকিয়ে রত্নরাজি আর মসলা। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম বণিকরাই মসলা, মূল্যবান ধাতু ও অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে আসতেন ইউরোপে।
কলম্বাসের উদ্দেশ্য ছিল এশিয়ার কিছু নির্দিষ্ট সমৃদ্ধ এলাকা অনুসন্ধান করা। সবাই তখন পূর্বদিকে তাকিয়ে ভারতবর্ষ বা এশিয়ায় যাওয়ার পথ খুঁজছিল। প্রথম যাত্রায় (১৪৯২) ক্রিস্টোফারের ধারণা ছিল ভিন্ন। ভেবেছিলেন, পশ্চিম দিক দিয়েই পৌঁছে যাওয়া যাবে পূর্ব এশিয়ার ভারতবর্ষ ও চীনা অঞ্চলগুলোতে। মানচিত্রের অজানা সমীকরণ, সমুদ্রের অনিশ্চয়তা, সবকিছু অগ্রাহ্য করে তিনি বিশ্বাস করলেন, এ দিকেই আছে সেই কাঙ্ক্ষিত ‘ইন্ডিজ’। ধনসম্পদে ভরা এক নতুন রাজ্য।
শুরু হয় তার যাত্রা। শুধু নতুন ভূমি আবিষ্কার নয়, বরং ভুল কোনো জনপ্রিয় ধারণা সত্য প্রমাণ করার এক প্রচেষ্টাও ছিল তার মনে। আর এ জেদই তাকে বারবার টেনে নেয় সমুদ্রে। প্রতিটি ঢেউ তাকে নিয়ে যায় নতুন কোনো দিকে। অথচ কলম্বাস খুঁজে ফেরেন এশিয়ার পথ। প্রথম যাত্রায় এশিয়া না গিয়ে ভিন্ন এক অঞ্চলে পৌঁছে যান তিনি। ক্যারিবীয় দ্বীপে পৌঁছে ভাবেন এটিই এশিয়ার সমৃদ্ধ সেই অঞ্চল।
দ্বিতীয় যাত্রা পরিচালিত হয় এক বছর পর, ১৪৯৩ সালে। ক্যারিবীয় দ্বীপের আবিষ্কৃত জায়গাগুলোয় ইউরোপীয় পাকা বসতি স্থাপন ছিল এই যাত্রার মূল লক্ষ্য। জাহাজে ছিল ১ হাজারের বেশি জনবল। ছিল গবাদি পশু ও অন্যান্য সরঞ্জাম।
কলম্বাসের তৃতীয় অভিযান পরিচালিত হয় ১৪৯৮ সালে। এবারও তার লক্ষ্য ছিল এশিয়ায় পৌঁছানো। কিন্তু এবার জগতবিখ্যাত এই নাবিক গিয়ে পৌঁছান ভেনেজুয়েলায়। কিন্তু কলম্বাস মনে করছিলেন, এবার ঠিকই এশিয়ায় পৌঁছে গেছেন তিনি। পরে তাও ভুল প্রমাণিত হয়।
এশিয়ার দিকে কলম্বাসের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অভিযান হলো তার চতুর্থ এবং সর্বশেষ যাত্রা। এই যাত্রা ছিল ১৫০২ সালে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই যাত্রা ছিল কলম্বাসের এশিয়া অভিযানের লাস্ট গ্যাম্বেল বা সর্বশেষ বাজি। এবারের মূল লক্ষ্য ছিল সংক্ষিপ্ত পথ ধরে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছান।
কলম্বাসের জীবনের শেষ সমুদ্রযাত্রাটি ছিল দীর্ঘ, ক্লান্তিকর অথচ রহস্যে ভরা এক অভিযান। স্বপ্ন, ভুল ধারণা আর কঠিন বাস্তবতা এক হয়েছিল এই অভিযানে। মূল লক্ষ্য ছিল এশিয়ার পূর্ব ভূখণ্ডে পৌঁছানোর জন্য একটি নতুন সমুদ্রপথ খুঁজে বের করা। বিশেষ করে এমন একটি প্রণালি খুঁজে বের করা, যা যুক্ত করবে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর।
১৫০২ সালের ১১ মে। স্পেনের ক্যাডিজ বন্দর থেকে চারটি জীর্ণ জাহাজ আর প্রায় দেড়শ মানুষ নিয়ে আবারও সমুদ্রপথে বেরিয়ে পড়েন কলম্বাস। তার বয়স তখন একান্ন। শরীর অসুস্থ, তবুও মনে অদম্য বিশ্বাস। আর একবার আর একটুখানি চেষ্টা, হয়তো এবার খুঁজে পাওয়া যাবে এশিয়া পৌঁছানোর সেই পথ। যে পথ তাকে নিয়ে যাবে পূর্ব এশিয়ার সম্পদশালী একটি দেশে। সঙ্গে ছিল কলম্বাসের প্রিয় ছোট ভাই বারথোলোমিউ আর ছেলে ফার্নান্দো।
চতুর্থ অভিযানের শুরুতেই আফ্রিকায় যান কলম্বাস। আফ্রিকার উপকূলে আরজিলায় গিয়ে বিপদে পড়া পর্তুগিজদের সাহায্য করার চেষ্টা করেন। তারপরের যাত্রা ক্যারিবীয় সাগরের দিকে। মার্টিনিক দ্বীপে পৌঁছানোর পরই আকাশে জমতে শুরু কালো মেঘ। বাতাসে যেন অশুভ সংকেত। কলম্বাস বুঝতে পারলেন, ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড় আসতে চলেছে। তাই আশ্রয়ের খোঁজে তিনি ছুটলেন হিস্পানিওলার দিকে।
সান্তো ডোমিঙ্গো বন্দরে পৌঁছে তিনি অনুরোধ করলেন, জাহাজগুলো যেন ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সতর্ক করলেন, যেন ধনরত্ন বোঝাই বড় নৌবহরটি এখনই না যায় সমুদ্রে। অভিজ্ঞতা থাকলেও ততদিনে রাজনৈতিক ক্ষমতা কমে এসেছে কলম্বাসের। শোনা হয়নি তার সতর্কবার্তা। জাহাজের গভর্নর তার অনুমান অগ্রাহ্য করেই নৌবহর নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। বাধ্য হয়েই নিজের জাহাজগুলো কাছের এক মোহনায় লুকিয়ে রাখলেন। প্রচণ্ড মাত্রায় ঝড় এলো। কিন্তু কোনোভাবে টিকে গেল কলম্বাসের জাহাজগুলো। ডুবে গেল বিশাল সেই নৌবহরের অনেক জাহাজ। সেই দুর্ঘটনায় কিছু জনবল আর স্বর্ণ তলিয়ে গেল সমুদ্রের অতলে।
এরপর শুরু হলো নতুন অনুসন্ধান। জ্যামাইকায় অল্প সময় থামলেন কলম্বাস। পাড়ি দিলেন মধ্য আমেরিকার উপকূলের পথে। হন্ডুরাস থেকে শুরু করে নিকারাগুয়ার দিকে। এক এক করে কোস্টারিকার অজানা তটরেখা খুলে যেতে লাগল তার সামনে। কোথাও যেন মূল্যবান ধাতুর হাতছানি, কোথাও বা অচেনা মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি। পানামার কাছে পৌঁছে তিনি শুনলেন, খুব কাছেই আছে আরেকটি সমুদ্র। এই খবর তার মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দিল যেন। ভাবলেন, হয়তো স্বপ্নের সেই পথ বেশি দূরে নেই আর।
কিন্তু প্রকৃতি বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল তাকে। ঝড়-বৃষ্টি, প্রতিকূল বাতাস, সবকিছু মিলিয়ে কলম্বাসের চতুর্থ যাত্রা হয়ে উঠল দুর্বিষহ। পানামার রিও বেলেন নদীর তীরে একটি ছোট দুর্গ গড়ল কলম্বাসের অভিযাত্রী দল। কিন্তু শান্তি ছিল না সেখানেও। স্থানীয়দের আক্রমণে হতাহত হলো কলম্বাসের দলের লোক। কলম্বাস বুঝলেন, টিকে থাকা সম্ভব নয় এখানে।
ফেরার পথও সহজ ছিল না তাদের জন্য। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল জাহাজগুলো। নির্দিষ্ট এক প্রজাতির পোকার আক্রমণে ক্ষয়ে যাচ্ছিল সরঞ্জাম আর জাহাজের কাঠ। কিউবার কাছে এসেই আবার ঝড়ের কবলে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই জ্যামাইকায় জাহাজ ভেড়ালেন। সেখানে ছিল না কোনো স্প্যানিশ উপনিবেশ। সম্পূর্ণ একা ছিলেন তারা। এক বছর ধরে সেই দ্বীপে আটকে রইলেন কলম্বাস আর তার গোটা অভিযাত্রী দল।
একসময় ফুরিয়ে এলো খাবার। স্থানীয়দের সদয় দৃষ্টি পেতে এক অদ্ভুত উপায় বের করলেন কলম্বাস। জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্যে তিনি আগে থেকেই জানতেন, শিগগির একটি চন্দ্রগ্রহণ হতে চলেছে। সেই ভবিষ্যদ্বাণীই কাজে লাগালেন। আসন্ন চন্দ্রগ্রহণের কথা আগেভাগেই জানিয়ে দিয়ে স্থানীয়দের বিস্মিত করে দিলেন তুখোড় এই নাবিক। স্থানীয়দের থেকে খাদ্য জোগান পেতে শুরু করল অভিযাত্রী দলটি। কিন্তু সাময়িকভাবে স্বস্তি ফিরে পেলেও বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করল নিজের লোকদের মধ্যে। বিশৃঙ্খলা দমন করতেন কলম্বাস নিজেই।
এক বছর এই অঞ্চলে থাকার পর তাদের উদ্ধার করা হয়। ১৫০৩ সালে ছোট্ট একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে হিস্পানিওলায় পৌঁছান তার বন্ধু ডিয়েগো মেন্ডেজ। সেখানে ছোট একটি জাহাজ বা ক্যারাভেল জোগাড় করতে সক্ষম হন মেন্ডেজ। ১৫০৪ সালের জুনে কলম্বাস ও তার দলকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় সেই জাহাজটি। অবশেষে নভেম্বর মাসে স্পেনে ফিরে যান কলম্বাস।
এটিই ছিল বিখ্যাত অথচ বিতর্কিত এই অভিযাত্রীর শেষ যাত্রা। যেখানে আশানুরূপ সাফল্য না থাকলেও ছিল আরও বেশি কিছু। স্বপ্ন ছিল, আবিষ্কার ছিল। এই দীর্ঘ যাত্রাই নতুন কিছু ভূখণ্ড এক করে দিয়েছিল ইতিহাসের পাতায়।




