গ্যাসের খোঁজে ১৮ হাজার ফুট নিচে
- চলছে ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীর কূপ খননের কাজ
- ব্যবহার হচ্ছে ২৬৮২ হর্সপাওয়ারের রিগ মেশিন
- দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ কোটি ঘনফুট
- মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হয়

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকার মোহাম্মদপুরসহ অনেক এলাকায় সকালে নাশতা তৈরি করা যায় না। সন্ধ্যে নাগাদ চুলায় যেটুকু গ্যাস আসে তাতে এক কাপ চায়ের পানিও ফোটে না। অনেকটা বাধ্য হয়েই দিনের পর দিন ধরে মাঝরাতে রান্না করেন বাসিন্দারা। অনেকে আবার কিনে নিয়েছেন ইলেকট্রিক বা ইনফ্রারেড চুলা।
শুধু বাসাবাড়ির চুলা নয়, গ্যাস সংকটের কারণে প্রায়ই বন্ধ থাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র; থেমে যায় সার কারখানার চাকাও। এ অবস্থা চলছে গত কয়েক বছর ধরেই।
দেশের গ্যাসের এই সংকট মোকাবিলায় মাটির আরও গভীরে, আরও সম্ভাবনার খোঁজে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার ৫ হাজার ৬০০ মিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীর কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া এই ডিপ ড্রিলিং চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিজিএফসিএলের তিতাস-৩১ গ্যাসফিল্ডে।
সোমবার (৪ মে) দুপুরে তিতাসের গ্যাসফিল্ডটিতে পৌঁছতেই চোখে পড়ল কর্মচঞ্চল পরিবেশ। চীনাকর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশিরা।
মাটির বুক চিরে নিরবচ্ছিন্ন শব্দে ঘুরছে ২৬৮২ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন উচ্চক্ষমতার আধুনিক রিগ মেশিন বা খনন যন্ত্র। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন লোহার এক বিশাল বৃক্ষ শেকড় নামাচ্ছে পৃথিবীর গভীরে, যেখানে লুকিয়ে থাকতে পারে নতুন গ্যাসভাণ্ডার।
দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের ইতিহাস রয়েছে। এবার চলছে সেই সীমা পেরোনোর চেষ্টা।
গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা ঝরল বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিকের কণ্ঠে। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, ‘এই কূপ খনন শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। যার গভীরতা ৪ হাজার ৩০০ মিটার। এতে মোট ব্যয় হবে ৫৯৪ কোটি টাকা।’
সবকিছু ঠিক থাকলে কূপ দুটিতে দুই টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, খনন শেষে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই জানা যাবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে আর কতটুকুই বা উত্তোলন করা যাবে, যোগ করলেন তিনি।
কাগজে-কলমে এখন দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে চাহিদা আরও বেশি, অন্তত ৫০০ কোটি ঘনফুট। যার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে আবার গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট আসে উচ্চমূল্যের আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। ফলে সত্যিই যদি দুই টিসিএফ গ্যাস পাওয়া যায়, তবে তা দেশের জ্বালানি সংকটে বড় ভূমিকা রাখবে।
কতদিন লাগবে সময়
তিতাসের এই কূপ খনন করতে সময় লাগবে ২১০ দিন। গত ১৯ এপ্রিল শুরু হওয়ার পর এরই মধ্যে কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর বাখরাবাদ-২১ ফিল্ডের খননে সময় ধরা হয়েছে ১৮০ দিন।
কূপ খনন শেষে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রমাণ হলেই শুরু হবে গ্যাস উত্তোলন। এরপর তা সরবরাহ হবে জাতীয় গ্রিডে।
সম্ভাবনার চার স্তর
সাধারণত মাটির ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৪০০ মিটারের মধ্যেই গ্যাসের অস্তিত্ব বেশি থাকে। তাই তিতাসেও মাটির নিচে মোট চারটি স্তরে গ্যাসের হাতছানি দেখছেন কর্মকর্তারা।
প্রথম স্তরটি ৩ হাজার ৭৩৬ থেকে ৩ হাজার ৭৬৫ মিটার গভীরে। শেষ স্তরটির গভীরতা ৫ হাজার ৩১৫ থেকে ৫ হাজার ৩৪৪ মিটার। মাঝখানে রয়েছে আরও দুটি সম্ভাবনাময় স্তর।
যত সম্ভাবনা তত ঝুঁকি
কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাটির নিচে ৩ হাজার ৭৫০ মিটার পার হলেই শুরু হবে উচ্চ চাপের এলাকা। এই চাপ সামাল দিতে না পারলে পুরো খনন প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবে। তাই বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এবার ব্যবহার হচ্ছে ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার ব্লো-আউট প্রিভেন্টর। অতীতের ১০ হাজার পিএসআইয়ের সীমাবদ্ধতা ভেঙে এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চপর্যায়ে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন উচ্চক্ষমতার রিগ আগে বাংলাদেশে ছিল না। প্রযুক্তিও এত উন্নত ছিল না। তাই এই প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, আছে বড় প্রত্যাশাও।
চীনা প্রতিষ্ঠানটির তাদের দেশে ১০ হাজার মিটার গভীরে কূপ খননের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে তারা বাংলাদেশেও যথাযথভাবে কাজ করতে পারবে, এমন প্রত্যাশা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের।



