বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় : পকেটে টান পড়ার শঙ্কা

প্রতীকী ছবি
জ্বালানি আমদানির খরচ, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ আর পাহাড়সম ভর্তুকির চাপ সামলাতে আবারও শুরু হয়েছে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া।
আজ সোমবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) এই সংক্রান্ত একটি সুপারিশ পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যেখানে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ১.২০ থেকে ১.৫০ টাকা পর্যন্ত। পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়লে প্রভাব পড়বে গ্রাহক পর্যায়েও।
আইন অনুযায়ী দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের (বৃদ্ধি অথবা হ্রাস) এখতিয়ার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। কাজটি করা হয় গণশুনানির মাধ্যমে একটি প্রক্রিয়ায়। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বিইআরসিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় বাড়িয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা ওঠলেও সরকারের ঘোষণা ছিল দাম না বাড়ানোর। কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বাজার অস্থির হয়ে ওঠলে নতুন করে আবার সামনে এসেছে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি।
এদিকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) ৬টি বিতরণ কোম্পানি। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাব অনুসারেই তাদের প্রস্তাব তৈরি করছে এই কোম্পানিগুলো। চলতি সপ্তাহেই সেগুলো পাঠানো হতে পারে বিইআরসিতে। এরপর বিইআরসি গণশুনানির মাধ্যমে ঠিক করবে নতুন দর।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সোমবার রাতে আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের প্রস্তাব তার কাছে আসেনি। প্রস্তাব পেলে নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া হবে পদক্ষেপ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নেওয়া হচ্ছে গ্রাহক পর্যায়ে ব্যবহারভিত্তিক স্তর অনুযায়ী ভিন্ন হারে মূল্য সমন্বয়ের পরিকল্পনা। মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে দাম। ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই বৃদ্ধি হতে পারে প্রায় ৭০ পয়সা। তবে লাইফলাইন বা স্বল্প ব্যবহারকারী গ্রাহকদের (৭০ ইউনিট পর্যন্ত) আপাতত রাখা হবে এই বাড়তি চাপের বাইরে।
বর্তমানে দেশে রয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহক পড়তে পারেন সরাসরি এই মূল্যবৃদ্ধির আওতায়। বাকি ৬৩ শতাংশ স্বল্প ব্যবহারকারীরা থাকবেন তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়বে পণ্য ও সেবার দামে।
এর আগে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের জন্য গত ৯ এপ্রিল গঠন করা হয় উচ্চপর্যায়ের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি। সেই কমিটিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে দাম অনেক বেশি হওয়ায় তা নিয়ে আপত্তি তোলে কমিটি।
আইএমএফের চাপ
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনায় প্রতিনিধিদল পাঠায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে টানা দুই সপ্তাহ চলে তাদের আলোচনা। প্রতিনিধিদলের সুপারিশ, বিদ্যুৎ খাতে দক্ষতা বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমাতে দরকার তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ। একই সঙ্গে পরামর্শ দেওয়া হয়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুরক্ষা রেখে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বিক্রয়মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতি ইউনিটে বর্তমানে ঘাটতি প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা ও তেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ হয়েছে আকাশচুম্বী। এছাড়া বসিয়ে রাখা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি ছাড়িয়ে যেতে পারে ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমলেও বাড়বে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়লে, পাল্লা দিয়ে বাড়বে উৎপাদন খরচও। প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে নিত্যপণ্যের দামের ওপর। ফলে মূল্যস্ফীতির এই বাজারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে পড়তে পারে আরও কঠিন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলছিলেন, বিদ্যুৎ খাতে লুটপাট ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম ঘাটতি। এই ঘাটতিকে ভিত্তি করে মূল্য সমন্বয়ের কোনো সুযোগ নেই। আগে বের করতে হবে ঘাটতির প্রকৃত কারণ, ঠিক করতে হবে বৈধতা। বাদ দিতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়। এরপর যদি বাস্তবেই থাকা ঘাটতি, তবেই কেবল হতে পারে গণশুনানির মতো প্রক্রিয়া।
মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রক্রিয়া ভোক্তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
এর আগে সবশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৮.৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ানোর এই উদ্যোগ জনমনে জন্ম দিচ্ছে নতুন উদ্বেগের।



