কক্সবাজার
মধ্যরাতে টিনের ঘেরা, শত কোটির সরকারি জমি দখল

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে মধ্যরাতে শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন আগে ইজারা বাতিল হয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসা সৈকতসংলগ্ন একটি মূল্যবান প্লট টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে একটি চক্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে।
আজ রবিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, মূল সড়ক থেকে সুগন্ধা সৈকতে প্রবেশের ডান পাশে বড় একটি জায়গা টিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকারদের দাবি, ঘেরাও করা জায়গাটির আয়তন ১০ একরের বেশি। বর্তমান বাজারদরে মূল্য অন্তত এক শ কোটি টাকা।
তবে জমিটি কারা ঘেরাও করেছে, সে বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি একসময় এস আলম গ্রুপের নামে ইজারা দেওয়া প্লটের অংশ। যার ইজারা পরে বাতিল হয়ে যায়। এ দখলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুক্রবার মধ্যরাতে ৩০ থেকে ৪০ জন শ্রমিক হঠাৎ করে টিন ও বাঁশ নিয়ে সেখানে হাজির হন। তাদের সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল অবস্থান করছিল। প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তড়িঘড়ি করে বড় অংশ ঘিরে ফেলা হয়।
ঘেরাওয়ের আগে এলাকায় দুই শতাধিক ভাসমান দোকান ছিল বলে জানান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দোকান সরিয়ে জায়গাটি ঘিরে ফেলার সময় কয়েকজন হকারের সঙ্গে শ্রমিকদের কথা-কাটাকাটি হয়। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ টিনের বেড়ার একটি অংশ ভাঙচুর করেন। তবে তখন কথিত দখলদারদের কাউকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী পরিচয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দখল কার্যক্রমে জড়িত। রাসেল নামের এক ব্যক্তি নিজেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নিরাপত্তাকর্মী পরিচয় দিয়ে এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। স্থানীয় যুবদল নেতা আজিজুল হক সোহেল এক ফেসবুক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, সুগন্ধা পয়েন্টের সরকারি জমি আবারও দখলবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে কি না। রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে সরকারি জমি দখলের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
সুগন্ধা পয়েন্টের এই জমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের ভূমি-বিতর্ক। সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন সরকারের ১ নম্বর খাস খতিয়ানের প্রায় ১৩০ একর জমিতে ২০০৩ সালে হোটেল-মোটেল জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই জমি ৮৭টি প্লটে ভাগ করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল।
ইজারার শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও অনেক ইজারাদার তা করতে পারেননি। পরে সংসদীয় কমিটি এবং ভূমি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি জেলা প্রশাসন ৫৯টি প্লটের ইজারা বাতিল করে। ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যান ইজারাদারেরা। প্রায় এক দশকের আইনি লড়াই শেষে ২০১৯ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
তথ্য অনুযায়ী, ৫৭টি প্লটের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে রায় বহাল থাকায় জেলা প্রশাসন পর্যায়ক্রমে জমিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালেই বাতিল হওয়া প্লটগুলোর বাজারমূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ছিল। বর্তমান বাজারমূল্য আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এ বিষয়ে নতুন কোনো সরকারি মূল্যায়ন হয়নি।
সরকারের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার পরও বাতিল প্লটগুলোর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একটি বাতিল প্লটে সি-ইন মার্কেটের মতো বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে। যেখানে ৫০টির বেশি দোকান চালু আছে। বিভিন্ন স্থানে দোকান, রেস্তোরাঁ, পরিবহন কাউন্টার ও আবাসিক কক্ষ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে আদালতের রায়ে সরকারের মালিকানায় ফিরে আসা জমি বাস্তবে পুরোপুরি জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুগন্ধা ও আশপাশের হোটেল-মোটেল জোনে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রায় ২ দশমিক ৩০ একর সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হয়েছিল। পরে প্রশাসনের যৌথ অভিযানে জমিটি দখলমুক্ত করে সেখানে সরকারি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। সুগন্ধার আরেকটি অংশে প্রায় ৫০ শতক সরকারি জমি দখলের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট যৌথ অভিযানে ঘেরাও অপসারণ করা হয়েছিল। তবে পরে সেখানেও পুনরায় দখলের অভিযোগ ওঠে।
এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, প্রশাসনের নাকের ডগায় সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হলেও শুরুতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তার মতে, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে দলের একটি অংশ সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন মূল্যবান জমি দখল করে ঝুপড়ি দোকান বা বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
তিনি উল্লেখ করেন, সৈকতসংলগ্ন এলাকা পরিবেশগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এবং ইজারার শর্ত পূরণ না করায় যেসব প্লটের ইজারা বাতিল হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়েও ইজারাদারেরা সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারেননি। ফলে বাতিল হওয়া জমিগুলোর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে রয়েছে।
তার দাবি, শুধু টিনের বেড়া সরিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। পুরো হোটেল-মোটেল জোনে সরকারি জমির দখল, ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত না হলে মূল্যবান সরকারি সম্পত্তি আবারও প্রভাবশালী দখলদারদের হাতে চলে যেতে পারে।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের মতে, কোন প্লট দখলমুক্ত, কোথায় স্থাপনা রয়েছে, কোথায় ব্যবসা চলছে এবং কোন জমি জেলা প্রশাসনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে- এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। বাতিল প্লটে কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান বা আবাসিক স্থাপনা থাকলে সেগুলোর বৈধতাও যাচাই করতে হবে।
এদিকে সাম্প্রতিক দখলচেষ্টার ঘটনায় জেলা প্রশাসন টিনের বেড়া ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণের জন্য শনিবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চার ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেয়। তবে, রবিবার দুপুর পর্যন্ত এবিষয়ে এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সায়েম জানিয়েছেন, সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় জড়িত একজনকে ইতিমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। জমির মালিকানা বা ইজারার পক্ষে কারও কাছে বৈধ নথি থাকলে তা জেলা প্রশাসক অথবা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে উপস্থাপনের জন্য বলা হয়েছে।
তার ভাষ্য, জেলা প্রশাসন কাউকে সরকারি জায়গা দখল বা টিন দিয়ে ঘেরাও করার অনুমতি দেয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবৈধ বেড়া ও স্থাপনা সরিয়ে না নিলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে সরকারি জমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি ভাসমান হকারদের উচ্ছেদ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, ফুটপাত বা সড়কের পাশে দোকান বসালে দ্রুত উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু রাতের আঁধারে সরকারি জায়গা টিন দিয়ে ঘিরে ফেলার ঘটনায় প্রথম দিকে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হকারদের একাংশ জানিয়েছে, তাদের দোকান ও ভ্যান সরিয়ে দেওয়া হলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে সরকারি জমি দখলমুক্ত করার পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের দাবিও উঠেছে








