রূপকথার বিয়ে যেন বাস্তবে! হাতির পিঠে বর, ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় কনের

রাজা-বাদশাদের বিয়ের গল্প কেবল রূপকথার বইতেই মানায়। আধুনিক যুগে দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি আর চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জার ভিড়ে হারিয়ে গেছে সেই সাবেকি আমেজ। তবে যান্ত্রিকতার যুগে যদি হঠাৎ দেখা যায় বর আসছে হাতির পিঠে চড়ে। আর সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে কনে যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ির পথে তবে কেমন হয়?
রূপকথার এমন দৃশ্যই দেখা গেল জয়পুরহাটে। বৃহস্পতিবার জয়পুরহাট সদর উপজেলার এক বিয়ে পুরো জেলায় ফেলেছে ব্যাপক আলোড়ন। পুরনো দিনের সেই নস্টালজিয়া আর রাজকীয়তা দেখতে রাস্তায় ভিড় জমায় হাজারও মানুষ।
যেভাবে শুরু এই রাজকীয় বিয়ের গল্প
গল্পের নায়ক ফারহান ফয়সাল (২৮)। তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন গর্বিত সদস্য। জয়পুরহাট সদর উপজেলার চকমোহন গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে তিনি। আর গল্পের নায়িকা ফারহানা আক্তার (২৬), একই উপজেলার পশ্চিম পুরানাপৈল সোনার পাড়া গ্রামের দুলাল হোসেনের মেয়ে।
কিন্তু কেন এই ব্যতিক্রমী আয়োজন? জানা গেল, এর পেছনে দুই পিতার স্বপ্ন। কনের বাবা দুলাল হোসেনের দীর্ঘদিনের শখ ছিল আদরের ছোট মেয়েকে বিয়ে দেবেন একেবারে ভিন্ন ধাঁচে। বর আসবে হাতির পিঠে চড়ে, আর মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবে ঘোড়ার গাড়িতে। অন্যদিকে, বরের মনেও ছিল হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করার সুপ্ত বাসনা। শ্বশুরের শখ আর বরের ছেলেবেলার স্বপ্ন— দুইয়ে মিলে দেখা গেল এমন বিরল বিয়ের দৃশ্য।
১৪ কিলোমিটার পথে জনতার ঢল
বৃহস্পতিবার দুপুর। চকমোহন গ্রাম থেকে পশ্চিম পুরানাপৈল গ্রামের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। সুসজ্জিত এক হাতির পিঠে রাজকীয় বেশে বর ফারহান। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে চারপাশের মানুষ। ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই যাত্রাপথের দুই পাশে নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপচে পড়া ভিড়। বর্তমান সময়ে এমন দৃশ্য কল্পনাতীত হওয়ায় যেন পলক পড়ছিল না উৎসুক জনতার। কেউ কেউ আবার মোবাইলের ক্যামেরায় করছিলেন বন্দি।
বিকালের দিকে বরযাত্রীর বহর নিয়ে হাতি যখন কনের গ্রামে পৌঁছায়, তখন সেখানে যেন ঈদের আনন্দ। পুরো গ্রাম ভেঙে পড়ে বর দেখতে।
কী বলছেন নবদম্পতি ও তাদের পরিবার?
এমন রাজকীয় আয়োজনে উচ্ছ্বসিত কনে ফারহানা আক্তার। এমন বিয়েতে নিজেকে ভাগ্যবতী মরে করছেন কনে। ‘আমার বিয়েতে বর হাতির পিঠে চড়ে এসেছে, আর আমি শ্বশুরবাড়ি ফিরলাম ঘোড়ার গাড়িতে। এটি আমার জীবনের এমন এক অন্যরকম অনুভূতি, যা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছে।’
বরের চোখেমুখেও ছিল স্বপ্নপূরণের আনন্দ। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে হাতির পিঠে চড়ে বিয়ে করতে যাওয়ার গল্প শুনতাম। তখন থেকেই মনের ভেতর একটা শখ তৈরি হয়েছিল। আজ আমার শ্বশুরের ইচ্ছায় আর পরিবারের আয়োজনে সেই শখ পূরণ হলো। আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত।
বরের বাবা ফজলুর রহমানের ভাষ্য, বেয়াইয়ের (কনের বাবা) শখ ছিল জামাই হাতির পিঠে আসবে আর মেয়ে যাবে ঘোড়ার গাড়িতে। সেই শখ পূরণেই হাতি ও ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে আনা হয় প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকা খরচ করে।
অন্যদিকে, কনের বাবা দুলাল হোসেনের চোখে তখন প্রশান্তির জল। ‘ছোট মেয়ের বিয়েতে ব্যতিক্রমী কিছু করার ইচ্ছে ছিল আমার। সংস্কৃতির সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী আয়োজনটি করতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। দুই পরিবারের সবাই মিলে খুব আনন্দ করেছি। সবাই আমার মেয়ে-জামাইয়ের জন্য আশীর্বাদ করবেন, ওরা যেন সুখে-শান্তিতে থাকে।’
একটি সুন্দর সমাপ্তি
বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন সন্ধ্যা নামছে, তখন নতুন এক জীবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন ফারহান ও ফারহানা। তবে কোনো ইঞ্জিন চালিত গাড়িতে নয়, টগবগিয়ে চলা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বরের বাড়ির পথ ধরেন কনে। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই বিয়ের গল্প জয়পুরহাটের মানুষের মুখে মুখে ফিরবে আরও বহুদিন।

