জয়পুরহাট
পচা আলুর গ্যাসে ‘ঝলসে’ যাচ্ছে বোরো চারা

ছবিঃ আগামীর সময়
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় কৃষকের সবুজ স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ছাই হয়ে যাচ্ছে। যে মাঠে থাকার কথা ছিল লক-লকে সবুজ বোরো ধানের চারা, সেই জমির কাদা এখন রূপ নিয়েছে বিষাক্ত গ্যাসের কূপে। পচে যাওয়া আলু থেকে নির্গত গ্যাসে একের পর এক ঝলসে যাচ্ছে নতুন রোপণ করা ধানের চারা। অসময়ের বৃষ্টিতে আলুর ক্ষতি সামলাতে না সামলাতেই নতুন এই বিপর্যয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের মাত্রাই, শালগুন, বিয়ালা, বলিগ্রাম এবং উদয়পুর ইউনিয়নের মোসলেমগঞ্জ, দুধাইল ও তেলিহার মাঠ ঘুরে দেখা গেছে এক ভয়াবহ চিত্র। বিস্তীর্ণ জমিতে ধানের চারার পরিবর্তে দেখা মিলছে পচা কাদা আর গ্যাসের বুদবুদ। কৃষকের মুখে হতাশা, চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটে ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। এর মধ্যে কালাই উপজেলায় চাষ হয় ১০ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে।
কিন্তু টানা বর্ষণে উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষকের ২ হাজার ৬৭২ হেক্টর জমির আলু পানিতে তলিয়ে পচে যায়। সেই পচা আলু থেকেই এখন তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস, যা ধানের চারার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে।
মাত্রাই ইউনিয়নের বলিগ্রামের কৃষক সুজয় বর্মন জানান, গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে এক একর বর্গাজমিতে আলু চাষ করেছিলেন তিনি। মার্চে ফলন ঘরে তোলার স্বপ্ন থাকলেও ওই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে টানা চার দিনের বৃষ্টিতে তার দুই বিঘা জমির আলু নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি একই জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করেন। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই বিষাক্ত গ্যাসে সব চারা ঝলসে যায়।
একই হতাশার কথা শোনালেন আঁওড়া গ্রামের কৃষক ছফির উদ্দিন। জানালেন, ঋণের টাকায় আলু করে পথে বসেছি। সেই ক্ষতি কাটাতে আবার ঋণ করে বোরো লাগালাম। এখন সব শেষ। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না—এলাকা ছাড়তে হবে কি না তাও ভাবছি।
আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হাতিয়র গ্রামের মোকারম হোসেন জানান, বৃষ্টির কারণে তার ৯০ শতক জমির আলু পচে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এরপর আরও ৩০ হাজার টাকা খরচ করে বোরো চাষ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত সব চারা নষ্ট হয়ে যায়।
‘জীবনে এমন বিপদে কখনও পড়িনি’ - বলছিলেন তিনি।
কৃষকদের অভিযোগ, জমিতে পচে থাকা আলু থেকে নির্গত গ্যাসের কারণে পচনজনিত রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের ধানের চারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক প্রথমবার চারা নষ্ট হওয়ার পর দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারও রোপণ করেছেন, কিন্তু কোনোভাবেই সফল হতে পারেননি। বাজারে চারার সংকট দেখা দেওয়ায় কেউ নতুন করে বীজতলা তৈরি করছেন, আবার কেউ বোরো আবাদ ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবছেন।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেছেন, ‘পচা আলু থেকে সৃষ্ট গ্যাসের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কৃষকদের আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু অনেকে দ্রুত ফলনের আশায় তড়িঘড়ি করে ধান রোপণ করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এই মানুষগুলো এখন সরকারি সহায়তা ও কার্যকর সমাধানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।















