ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি দিলেও সুফল মিলবে না ৯ কারণে

চট্টগ্রাম বন্দরের হৃৎপিণ্ড নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া থামায়নি বর্তমান বিএনপি সরকার। দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের এনসিটিতে বিনিয়োগ প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে এখনো। এতে দেশ বা সরকারের কী লাভ-ক্ষতি হবে, সে অঙ্কই গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যবহারকারীদের কাছে।
এনসিটি বর্তমানে বন্দরের টার্মিনাল-জেটির মধ্যে সবচেয়ে ভালো দক্ষতা দেখাচ্ছে। কনটেইনার ওঠানামায় ৪৫ শতাংশ এবং বন্দরের রাজস্ব আয়ের ৫৫ শতাংশ আসে এই টার্মিনাল থেকে। লাভে থাকা টার্মিনালের এমন কিছু কাঠামো ও পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেগুলোর সমাধান না করে বিদেশি অপারেটর এলেও জাদুর মতো রাতারাতি সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এবার জানা যাক এর সীমাবদ্ধতা কী। প্রথমত এনসিটির ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যাওয়া, এই অবকাঠামোয় বড় গ্যান্ট্রি ক্রেন বসাতে না পারা, কর্ণফুলী নদীর নাব্য কম থাকা, বড় জাহাজ প্রবেশে সীমাবদ্ধতা, জোয়ার-ভাটার সমস্যা, সনাতন পদ্ধতিতে পণ্যের কায়িক পরীক্ষা, বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান ২৪ ঘণ্টা সচল না থাকা, কাস্টমসের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নেওয়া, পণ্য ডেলিভারির মাল্টিমোডাল (সড়ক-রেল-নৌপথ) কানেকটিভিটি নিশ্চিত না করা।
এরকম বহুমুখী সীমাবদ্ধতার মধ্যে যদি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্দর ব্যবস্থাপনার অপারেটরকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটি বেশি ফলদায়ক হবে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার এ প্রক্রিয়াকে ‘অযৌক্তিক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী’ বলছেন। ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড দুবাইভিত্তিক হলেও বাস্তবে এটি আমেরিকার পকেট প্রতিষ্ঠান, যা বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার স্বার্থ নিশ্চিত করবে। জেনেশুনে কেন আমরা সে ঝুঁকিতে পড়ব। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এনসিটির মতো বন্দরের হৃৎপিণ্ড কেন বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেব’— ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন এই অর্থনীতিবিদ।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশের বন্দর-টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় সফলভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। সেসব বন্দরের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এনসিটির কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কী সে পার্থক্য? চট্টগ্রাম হচ্ছে ‘পণ্যের শেষ গন্তব্যের বন্দর। এ পণ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই পৌঁছে। সিঙ্গাপুর বন্দরের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হচ্ছে, বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে পণ্য সিঙ্গাপুরে নেমে আরেক জাহাজে অন্য দেশে চলে যায়, যা শিপিংয়ের পরিভাষায় বলা হয় ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর। এ পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণেই চট্টগ্রাম বন্দরে তৈরি হয় বিভিন্নমুখী জটিলতা। যেমন— জাহাজে আসা কনটেইনারভর্তি পণ্য প্রথমে এনসিটি ইয়ার্ডে রাখা হয়। এরপর আমদানিকারকের চাহিদা অনুযায়ী ইয়ার্ডে কনটেইনার খুলে কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষা চলে। এরপর রাজস্ব পরিশোধ শেষে কাস্টমসের ছাড়পত্র। এ কাজ করতে গিয়ে সাড়ে ৯ দিন একটি কনটেইনার ইয়ার্ডে পড়ে থাকে।
বিশ্বের কোনো দেশেই এখন বন্দরের মতো সংরক্ষিত এলাকায় কনটেইনার খুলে পণ্য পরীক্ষার এমন সনাতনী পদ্ধতি কার্যকর নেই। এমনকি ডিপি ওয়ার্ল্ড যে ৪০টি দেশে বন্দর ব্যবস্থাপনা করছে, সেখানে তো এমন পদ্ধতি নেই-ই। ফলে জাহাজ থেকে কনটেইনার যত দ্রুতই নামানো হোক, বন্দর থেকে ডেলিভারি সমান গতিতে না হলে তার সুফল কীভাবে মিলবে?
এত গেল এনসিটির ভেতরকার সীমাবদ্ধতার কথা। জাহাজ থেকে দ্রুত কনটেইনার নামল ঠিকই, সেটি বন্দর থেকে বের হয়েই শহরে যানজটে পড়ে। জাহাজ থেকে পণ্য নামার গতির সঙ্গে ডেলিভারির গতি না থাকলে বন্দরের ভেতরে-বাইরে জট লাগে। এতে দ্রুত পণ্য ওঠানামা সম্ভব হয় না। পৃথিবীর সব বন্দরেই মাল্টিপল ডেলিভারি সিস্টেমে সড়ক, রেল ও নৌপথে পণ্য গন্তব্যে পৌঁছায়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের ক্ষেত্রে সেটি একেবারেই অসম্ভব।
কীভাবে? বলছি। বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারির ৯৬ শতাংশই যায় সড়কপথে। রেলপথে ৩ শতাংশ। নৌপথে ১ শতাংশ। চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে পণ্য পরিবহনে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক না থাকায় দ্রুত পণ্য আমদানিকারকের কাছে পৌঁছায় না, রপ্তানিকারক দ্রুত পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে পারেন না। এখানে এফিসিয়েন্সি কীভাবে বাড়াবেন বিদেশি অপারেটর।
এরকম কঠিন বাস্তবতা আরও আছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি জোয়ার-ভাটানির্ভর। জোয়ারের সঙ্গে মিল রেখে জাহাজ চলে। এনসিটিতে বড় জাহাজ ভিড়ল, সর্বাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেন লাগিয়ে অস্বাভাবিক দ্রুততায় কনটেইনার জাহাজ থেকে নামল; কিন্তু জাহাজ জেটি থেকে বের হতে পরবর্তী জোয়ারের জন্য কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হবে। ফলে দ্রুত কনটেইনার নামানোর সুফল জোয়ারের সীমাবদ্ধতায় আটকে যাবে।
সীমাবদ্ধতা আরও আছে। প্রতিদিন বড় ধরনের ড্রেজিং করার পরও কর্ণফুলী নদীর বর্তমান নাব্য সর্বোচ্চ ১০ মিটার (প্রায় ৩২ ফুট) এবং সর্বোচ্চ ২০০ মিটার (প্রায় ৬৫৬ ফুট) দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভিড়তে পারে। নাব্য কম থাকায় ও নদীতে জটিল বাঁক থাকায় এর চেয়ে বড় জাহাজ ভেড়ানো যাবেই না। এখনকার চেয়ে বড় জাহাজ ভেড়াতে না পারলে ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন দক্ষতা দেখাবে কীভাবে।
এনসিটির সীমাবদ্ধতা ও সংকট বিদেশি অপারেটরের পক্ষে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব। এসব চ্যালেঞ্জ উত্তরণে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যকর সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত লাগবে, প্রয়োজন হবে বড় বিনিয়োগের।
সেসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে উত্তরণ ঘটবে, তা জানতে সরকারের প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে ১০ দিন ব্যক্তিগত মোবাইলে আটবার কল, চারবার মেসেজ পাঠানো হয়। তার চাহিদা অনুযায়ী প্রশ্ন পাঠানো হয়; কিন্তু উত্তর মেলেনি। পরে পিপিপি এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিসের ল্যান্ডফোনে কল করা হয়; কিন্তু সাড়া মেলেনি।
পিপিপি কর্তৃপক্ষ তখন জিটুজি ভিত্তিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের দেওয়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আশিক চৌধুরী চুক্তি স্বাক্ষরের দিনক্ষণ ঠিক করেন। শ্রমিক আন্দোলনের মুখে তখন সেটি স্থগিত করতে বাধ্য হন। ফলে তার বক্তব্য জানা প্রয়োজন ছিল। সর্বশেষ গতকাল (২ জুন) সন্ধ্যা ৬টায় দুই দফায় তার মোবাইলে ফোন করে সাড়া পাওয়া যায়নি। রিং হচ্ছেই। এসএমএসও পাঠানো হয়।
এনসিটি বিদেশি ব্যবস্থাপনার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে ২০২৩ সালে। এখন নতুন করে এগোচ্ছে সে প্রক্রিয়া। ডিপি ওয়ার্ল্ড এখন এনসিটির পাশাপাশি চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) ব্যবস্থাপনাও চায়। আর সব প্রস্তাব যাচাইয়ে চট্টগ্রাম বন্দর, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি, ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান বন্দর সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ।
অগ্রগতির বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছে। প্রক্রিয়া শেষ হলেই জানতে পারবেন। কতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা পড়বে, তার সময়সীমা দেওয়া নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীরা চান রেডিমেড এই টার্মিনাল বিদেশি অপারটেরকে দেওয়া না হোক। ৩৭ বছর ধরে বন্দরে পণ্য ওঠানামার বার্থ অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন কসমস এন্টারপ্রাইজের মালিক এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। বিএনপি থেকে সংসদ সদস্য হয়ে এখন সংসদে হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এনসিটির বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার বিরোধিতা করে বললেন, ‘বিদেশি অপারেটর দেওয়ার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। এনসিটির বেশ ভালো আউটপুট আমরা পাচ্ছি। বিশ্বের অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন বসালেও এর চেয়ে বেশি দক্ষতা দেখাতে পারবে না। সীমাবদ্ধতাগুলো বিদেশি অপারেটর উত্তরণ করতে পারবেন না, তার সে ক্যাটাগরির অভিজ্ঞতাও নেই।’
তার প্রশ্ন, বন্দরের জিসিবির ১২ জেটিতে আধুনিক ক্রেন, প্রযুক্তি দিয়ে দক্ষতা দেখানোর সুযোগ আছে; কিন্তু বিদেশিরা সেখানে যাবে না। তাদের নজর শুধু রেডিমেড, লাভজনক এনসিটি, সিসিটি টার্মিনাল। পারফরম্যান্স যদি দেখাতেই হয়, তাহলে নতুন বে টার্মিনালে বিনিয়োগ করুক। উন্মুক্ত দরপত্র ডেকে দেশি অপারেটরকে সেখানে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলে ভালো কিছু হবে।
এনসিটি বিদেশি ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের একজন নুরুল্লা বাহার; যিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন শ্রমিক দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তার ভাষ্য, ‘আমার দল ক্ষমতায় আসার পরও এনসিটি বিদেশিদের দেওয়া যাবে না। সরকারের অবস্থান যা-ই হোক, শ্রমিক এবং দেশের স্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্ত রুখে দিতে আমরা অনড় আছি।’
বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোলে নতুন করে শ্রম আন্দোলন শুরুরও আভাস মিলছে এই শ্রমিক দল নেতার কাছে থেকে।




