চট্টগ্রাম টু ঢাকা
পাঁচ ঘণ্টার ‘জার্নি বাই মাইক্রোবাস’

চার লেনের চকচকে পিচঢালা পথ, সড়কদ্বীপে রঙবেরঙের ফুলের বাগান—বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে ইউরোপের কোনো আধুনিক মহাসড়ক। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। চট্টগ্রাম সিটি গেট থেকে শুরু করে রাজধানীর প্রবেশদ্বার কাঁচপুর পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ধরা পড়েছে পদে পদে আইন অমান্য, খামখেয়ালি ও প্রশাসনিক অবহেলার চিত্র। পুরো যাত্রাপথে হাইওয়ে পুলিশের কার্যকর কোনো উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
ওভারব্রিজ ফাঁকা, সড়ক বিভাজক ভেঙে জীবনের ঝুঁকি
মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য নির্মিত ফুটওভার ব্রিজগুলো যেন কেবলই শোপিস। পথচারীদের অধিকাংশকেই দেখা গেছে ওভারব্রিজ এড়িয়ে দ্রুতগতির বাসের সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হতে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দৃশ্য দেখা গেছে সড়ক বিভাজকগুলোতে। পারাপারের সুবিধার্থে সড়ক বিভাজকে বসানো লোহার শক্ত ব্যারিকেড বাঁকা ও দুমড়ে-মুচড়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি করা হয়েছে। সেই সংকীর্ণ ফাঁক গলেই নারী-শিশুসহ পথচারীরা চলন্ত গাড়ির সামনে লাফিয়ে উঠছেন।
তিন চাকার উল্টো যান ও বেপরোয়া যাত্রী ওঠানামা
মহাসড়কে গতি পাওয়ার আগেই হঠাৎ ব্রেক কষতে হচ্ছে দূরপাল্লার যানগুলোকে। কারণ, মূল লেনে অবাধে ও বেপরোয়া গতিতে চলছে নিষিদ্ধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও তিন চাকার যান। এসব যান কেবল চলছেই না, কোনো তোয়াক্কা না করে দূরপাল্লার গাড়ির মুখোমুখি উল্টো পথেও ছুটে আসছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যেখানে-সেখানে এলোপাতাড়ি বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার প্রতিযোগিতা। মাঝরাস্তায় বাস আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার কারণে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
ইলিয়টগঞ্জে দুই চালকের হাতাহাতিতে স্থবির মহাসড়ক
নিয়মভঙ্গ আর বিশৃঙ্খলার চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে কুমিল্লা অঞ্চলের ইলিয়টগঞ্জে। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে কথা কাটাকাটিতে জড়ান মাইক্রোবাস ও বাসের দুই চালক। মুহূর্তের মধ্যে সেই বচসা রূপ নেয় হাতাহাতিতে। আশপাশে কোনো পুলিশ বা ট্রাফিক কনস্টেবল না থাকায় এই সামান্য ব্যক্তিগত বাগ্বিতণ্ডাকে কেন্দ্র করেই পেছনের লেনে আটকে পড়ে শত শত যানবাহন, তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।
খানাখন্দে ভরা মহাসড়ক
চট্টগ্রাম সিটি গেট থেকে ফেনী পর্যন্ত মহাসড়কের দীর্ঘ অংশে দেখা গেছে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত ও ভাঙন। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও অতিরিক্ত ওজনের ভারী যান চলাচলের কারণে বিটুমিন উঠে তৈরি হয়েছে এসব খানাখন্দ। দ্রুতগতিতে থাকা গাড়িগুলো এসব গর্তে পড়ে যেমন নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশও।
সুন্দরের পাশে দুর্গন্ধের অভ্যর্থনা
মহাসড়কের আইল্যান্ডে ফুটে থাকা হরেক রঙের ফুল চোখের আরাম দিলেও, সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। বিভিন্ন পয়েন্টে সড়কের ঠিক পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়। সবচেয়ে বাজে দৃশ্য দেখা যায় ঢাকায় ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে—কাঁচপুর সেতুর আগের অংশের ডান পাশে ডাম্পিং করা হয়েছে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ। রাজধানী ও অর্থনীতির মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই মহাসড়কের প্রবেশদ্বারে দুর্গন্ধ ও ময়লার ভাগাড় যেন যাত্রীদের জন্য এক করুণ 'অভ্যর্থনা'।
চার ঘণ্টার যাত্রা পথে লেগেছে পাঁচ ঘণ্টা
সকাল ৯টায় চট্টগ্রামের জেলা স্টেডিয়াম থেকে যাত্রা শুরু করে ঢাকার কারওয়ানবাজার পৌঁছায় দুপুর দুইটায়।
২৪০ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সময় লেগেছে প্রায় ৫ ঘণ্টা। অথচ চার লেনের উন্নত মহাসড়কে স্বাভাবিক গতিতে এই পথ পাড়ি দিতে বড়জোর তিন ঘণ্টা লাগার কথা। পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত পারাপার, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, উল্টো পথে তিন চাকার যানের নৈরাজ্য এবং খানাখন্দের কারণে কেবল সময়ের অপচয়ই হয়নি, পুরো যাত্রাপথজুড়ে যাত্রী ও চালকদের সহ্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের অনুপস্থিতি
চট্টগ্রাম থেকে কাঁচপুর পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রাপথে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরানো বা নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিত। কোথাও কোনো চেকপোস্ট বা নিয়মিত টহলের অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। প্রশাসনের এই উদাসীনতা ও নজরদারির অভাবেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আজ প্রতিনিয়ত রূপ নিচ্ছে বিশৃঙ্খলা আর দুর্ঘটনাপ্রবণ এক রুট হিসেবে।




