আর্জেন্টিনার মতো ব্রাজিলও আছে বেশ ভালোভাবে

ছবি: আগামীর সময়
আর্জেন্টিনা উন্মাদনায় বুঁদ হয়েছিল ফুটবলপ্রেমীরা। এতো উত্তেজনা, এতো আবেগ, এতো উচ্ছাস আগে কখনো দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল এই বাংলাদেশে এখন একক রাজত্ব আর্জেন্টিনার। কয়েকদিন আগেও এ ভাবনায় সবাই যখন আক্রান্ত তখন আকাশের ছোট ছোট তারারা দলবেঁধে নেমে এলো মাটিতে। আর এদের সবার গায়ে হলুদ-সবুজ রঙের উত্তাল-দ্যোতনা। এরা নেইমারের ব্রাজিল, রোনাল্ডোর ব্রাজিল, পেলের ব্রাজিল।
বন্দর নগরীর অনেক স্পটে বড় স্ক্রিন লাগানো তার সামনেই হাজার হাজার মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা বসে পড়া। পাড়া ছেড়ে নগরীর বড় মোড়ে, ঘর ছেড়ে বন্ধুদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা হয়ে জ্বলে উঠছে ব্রাজিলভক্তরা। কাল রাতে বুঝা গেছে ব্রাজিল আছে, বেশ ভালোভাবেই আছে।
আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের খেলা মানেই থমকে যাওয়া যান্ত্রিক জীবন। সব ব্যস্ততা ও কোলাহল ভুলে বন্দরনগরী মেতে ওঠে আনন্দ উৎসবে। প্রিয় দলের জয় দেখতে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা পাড়ার চেনা-অচেনা সব মুখ এক হয়ে যায়। নবীন-প্রবীণের এই মিলনমেলা ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে রূপ নেয় মহাসমারোহের মহাসমাবেশে।
গতকাল সোমবার রাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বাঁচা-মরার লড়াই দেখতে পুরো চট্টগ্রাম রূপ নেয় উৎসবের নগরীতে।
সুদূর আমেরিকার টেক্সাসের হিউস্টন স্টেডিয়ামে যখন ৬৮,৭৭৭ জন দর্শক গ্যালারি কাঁপানো চিৎকারে ব্যস্ত, ঠিক তখনই চট্টগ্রামের ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের শহরে ছিলো একই উন্মাদনা। হিউস্টনের গ্যালারি যেমন হলুদ-সবুজে ছেয়ে ছিল, চট্টগ্রামের প্রতিটি খেলা দেখার স্পটও সেজেছিল ওই রঙে। তবে এশিয়ান পরাশক্তি জাপানের সমর্থকও কম ছিল না। বিশেষ করে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এদিন জাপানের জার্সি বা পতাকা গায়ে দিয়ে দলটির পক্ষে গলা ফাটাতে বসে যান স্ক্রিনের সামনে।
এই ম্যাচকে কেন্দ্র করে নগরের চকবাজার বালি আর্কিড, ২ নম্বর গেট মোড়, কাজীর দেউড়ি মোড়, সিটি গেইট, হালিশহর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন স্পটে বড় পর্দায় খেলা দেখতে ভিড় জমান হাজারো ফুটবলপ্রেমী। খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই এসব স্পট লোকে-লোকারণ্য।
রেফারির বাঁশিতে রাত ১১ টায় শুরু খেলা। ম্যাচের ২৯ মিনিটে শহরের ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোর সামনে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। জাপানের প্রথম গোল যখন ব্রাজিল ভক্তরা স্তব্ধ, ঠিক তখনই উল্লাসে ফেটে পড়েন জাপানি সমর্থক ও আর্জেন্টিনা ভক্তরা। ওই এক গোলেই প্রথমার্ধের খেলা শেষ হলে ব্রাজিল সমর্থকদের টেনশন বাড়ে। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরুর পর সেই টেনশনের মাত্রা বাড়ে বহুগুণ ।
মাঠে যখন ফুটবলারদের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, ঠিক তখনই সাইবার যুদ্ধ শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ব্রাজিল বুঝি এবার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছে। খুশিতে ফেসবুকের টাইমলাইন ভরে ওঠে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ট্রল আর স্ট্যাটাসে। কেউ খোঁচা দিয়ে লিখছিলেন, কেউবা সান্ত্বনা দিয়ে বলছিলেন, 'এবারের মতো বিদায় নাও ভাই।'
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৬ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত সেই ক্ষণ আসে। অভিজ্ঞ কাসেমিরোর দুর্দান্ত হেডে ম্যাচে সমতা আনে ব্রাজিল। গোলটি হওয়ার সাথে সাথে যেন দমবন্ধ হওয়া এক পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পায় ব্রাজিল সমর্থকরা। মুহূর্তেই আনন্দের জোয়ার বয়ে যায় চারপাশে। আলো আসবেই এরকম আশার আলো দেখতে থাকে ব্রাজিল সমর্থকরা।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা মেলেনি। ম্যাচের ইনজুরি টাইমের (নষ্ট সময়ে) খেলা চলছিল তখন। ব্রাজিলের শিবিরে তখন উৎকণ্ঠা। তবে কি পেনাল্টি শুটআউটে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা দিতে হবে। না, ব্রাজিল সেই সুযোগ দেয়নি। ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে, ৯৬তম মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির আচমকা জয়সূচক গোলটি আসে।
জাপানকে ২-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল শেষ- ১৬ নিশ্চিত করতেই চট্টগ্রামের রাতের আকাশ আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে ভুভুজেলা আর আতশবাজির আলোয়। চারদিকে শুধু ‘ব্রাজিল, ব্রাজিল’ স্লোগান। এতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা ব্রাজিলের বিপক্ষে স্ট্যাটাস দিচ্ছিলেন, তারা যেন কোথায় হারিয়ে গেলেন। ফেসবুকজুড়ে কেবলই হলুদ-সবুজের জয়গান।
তবে ফুটবলপ্রেমীদের এই উন্মাদনা এখানেই শেষ নয়। আগামী ৩ জুলাই আফ্রিকার দেশ কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা। সেদিনও চট্টগ্রামে দেখা যাবে ঠিক একই রকম আবহ। যদিও খেলাটি পড়েছে রাত ৪টায়। চিত্রটি একই থাকবে, শুধু রঙটা বদলে হয়ে যাবে আকাশী-নীল!




