৩ সরকারি সংস্থায় বিলীন পাহাড়
- তালিকায় জরিপ অধিদপ্তর, সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর
- ৩৩ বছরে ১৮ বর্গকিলোমিটার পাহাড় কাটা হয়েছে
- বাস্তবে পাহাড় জরিপে শণখোলা, নাল জমি, পুকুর
- পাহাড় টিলায় নকশা অনুমোদন সিডিএর

সংগৃহীত ছবি
আদালতের নিষেধাজ্ঞার পরও চট্টগ্রামে থেমে নেই পাহাড় কাটা। একাধিক গবেষণা ও জরিপের তথ্য বলছে, ৫০ বছরে বিলীন হয়েছে জেলার ছোট-বড় প্রায় ২০০ পাহাড়। আর এসব পাহাড় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পেছনে দায় রয়েছে তিন প্রধান সরকারি সংস্থার। সংস্থাগুলোর ভুল জরিপ, পাহাড়ি ভূমিতে ভবন অনুমোদন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে থামানো যায়নি পাহাড়ধসের মহোৎসব।
পাহাড়ধসে দায়ী সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন জরিপ ও রেকর্ড অধিদপ্তর এবং ভূমি অফিস। অন্য দুটি হলো চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তর। অবশ্য জেলা প্রশাসন, রেলওয়ে, ওয়াসা, গণপূর্ত, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার উদাসীনতার দায়ও অনেক। এর মধ্যে জরিপ ও রেকর্ড অধিদপ্তর গোড়াতে ভুল করে ভূমিকা রেখেছে পাহাড়ের মূলোৎপাটনে। চট্টগ্রামের শতাধিক পাহাড়কে পুকুর, ভিটা, বাগান, শণখোলা, নাল জমি হিসেবে বিএস জরিপে অন্তর্ভুক্ত করেছে তারা। সিডিএর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ পাহাড়ি এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার। এ ছাড়া সিডিএ নিজেও ১৬টি পাহাড় কেটে নির্মাণ করেছে বায়েজিদ লিংক রোড। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা ও জরিমানা আরোপের মতো ব্যবস্থা পাহাড় কাটা রোধে পর্যাপ্ত নয়।
পাহাড় কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক মো. জিয়াউদ্দীন আগামীর সময়কে বললেন, ‘নানা কারণে পাহাড় শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে জরিপ যেমন একটা সমস্যা, তেমনি অন্যান্য বিষয়ও জড়িত। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি কীভাবে জরিপ সংশোধন করা যায়।’
পাহাড়ি ভূমিতে নকশা অনুমোদন: নগরীর পশ্চিম খুলশী জালালাবাদ এলাকার ১ নম্বর গার্ডেন হাউজিং সোসাইটি সড়কের পাহাড়ি ভূমিতে নির্মিত হচ্ছে ‘সেন্ট্রাল হোমস’ নামে একটি বহুতল ভবন। খুলশী মৌজার এ ভবনের জায়গাটি টিলা শ্রেণির। পাহাড় কাটার দায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন মালিকদের জরিমানা করে। কিন্তু ২০২৪ সালে প্রস্তাবিত ভবনটির ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেয় সিডিএ। সংস্থার নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী স্বাক্ষরিত অনাপত্তিপত্রে বলা হয়, জমিটি টিলা শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দেয়নি। তারপরও সিডিএ ওই বছরের ডিসেম্বরে নয়তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটি এখন তৃতীয়তলা পর্যন্ত উঠে গেছে।
২০২৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের তখনকার পরিচালক হিল্লোল বিশ্বাস সিডিএকে একটি চিঠি দেন। এতে বলা হয়, ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর তোয়াক্কা না করে পাহাড়, টিলা বা পুকুর হিসেবে শ্রেণিভুক্ত ভূমিতে সিডিএ কর্তৃক ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।’
চিঠিতে কয়েকটি ভবনের নকশার উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে ২০১৬ সালে পাহাড়তলী মৌজার বিএস দাগ নম্বর ১১০ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির ভূমিতে একটি আটতলা ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়। ২০২৩ সালে খুলশী মৌজার বিএস দাগ নং-২৫ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির ভূমিতে একটি ছয়তলা ভবন অনুমোদন করে। পূর্ব নাছিরাবাদ মৌজার বিএস দাগ নম্বর-২৮১ (অংশ)-এর টিলা শ্রেণির ভূমিতে ২০০৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ছয়টি ভবনের নকশা অনুমোদন করেছে সিডিএ। ২০২০ সালে আসকারদীঘি এলাকার গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক পাহাড়ের পাদদেশে ১৪-তলা ভবনের নকশা অনুমোদন করে সিডিএ।
বিভাগীয় কমিশনার বললেন, ‘আগে সিডিএ অনেক পাহাড়ি জায়গায় নকশা অনুমোদন করেছে। এখন মনে হয় না তারা আর এটি করবে। কারণ তাদের কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে আইন অনুযায়ী বাস্তবে দেখে নকশা দিতে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএর অথরাইজড কর্মকর্তা-১ কাজী কাদের নেওয়াজ জানালেন, পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে হবে, এমন শর্তসাপেক্ষে টিলা শ্রেণিতে নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু পাহাড়ি ভূমিতে অনুমোদন দেওয়া হয় না।’
বাস্তবে পাহাড় জরিপে নেই: স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বিএস জরিপ শুরু হয়। ১৯৮৫ সালে জরিপ সম্পন্ন হয়। জরিপে বেশ কিছু পাহাড়কে নাল, শণখোলা, খিলা, বাড়িভিটা ইত্যাদি নামে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। এই সুযোগটি ব্যবহার করে পাহাড়খেকোরা।
২০২৪-২৫ সালে জেলা প্রশাসন বাস্তবে পাহাড় ও টিলা রয়েছে কিন্তু জরিপে নেই— এ রকম পাহাড়ি ভূমি চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে নগরীর সবচেয়ে বেশি ভুল দেখা গেছে কাট্টলী ভূমি সার্কেলের অধীন খুলশী মৌজায়। এখানে ৮২ দশমিক ১৪ একর পাহাড়কে শণখোলা দেখানো হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বর্তমানে খুলশীর এসব পাহাড়ি ভূমির অর্ধেকের বেশি আবাসিক এলাকা। একই সার্কেলের পূর্ব নাছিরাবাদে প্রায় ১৩ একর, পশ্চিম পাহাড়তলীতে সাড়ে ১৩ একর পাহাড়ি ভূমির ভুল জরিপ হয়।
নগরীর বাইরে সবচেয়ে বেশি প্রায় সাড়ে ১২০০ একর পাহাড় ও টিলার শ্রেণি পরিবর্তন হয় বিএস জরিপে। সীতাকুণ্ডে পরিবর্তন হয় ৮৯ একর।
জরিপকাজ করে সাধারণত জরিপ ও রেকর্ড অধিদপ্তরের অধীন জেলা সেটেলমেন্ট অফিস। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান বললেন, ‘৪০ বছর আগে বিএস জরিপের সময় এ ধরনের শ্রেণি নির্ধারণ ভুল হয়েছে। এখন এগুলো সংশোধনের দায়িত্ব আর জরিপ দপ্তরের নেই। এগুলো আদালতের মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।’
বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বললেন, ‘আগে জেলা প্রশাসন একটা তালিকা দিয়েছিল তাড়াহুড়া করে। জরিপ সংশোধনের আগে আমরা আবার সবগুলো সংস্থার কাছে একটা তালিকা চেয়েছি। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’
পাহাড় কাটার পর হুঁশ ফেরে পরিবেশ অধিদপ্তরের: পূর্ব নাছিরাবাদ মৌজার নাগিন পাহাড়ের অংশ কেটে গড়ে উঠেছে গ্রিনভ্যালি আবাসিক এলাকা। দুই যুগ আগে এই পাহাড় কাটা হয়। এখানে প্রায় ৫০টি ভবন নির্মিত হয়েছে। ভবন ওঠার দুই দশক পর ২০১৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর এখানকার ২৯টি ভবনকে পাহাড় কাটার ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরিমানা করেছিল।
এই আবাসিকের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম বললেন, ‘এখানে ভবন তোলা হয়েছে সিডিএর অনুমোদন নিয়েই। এগুলো দুই যুগ আগেই তোলা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর একবার জরিমানা করে।’
আসকারদীঘির পাড়ের গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক পাহাড় কাটার সময়ও ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করে। কিন্তু পাহাড় রক্ষা করা যায়নি।
পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করে বিভিন্নজনকে। মামলা করা হয়েছে ১৯টি। খুলশী থানার রূপসী পাহাড়টি কাটা হচ্ছে প্রায় তিন বছর ধরে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বললেন, ‘রূপসী পাহাড় শণখোলা শ্রেণির। আমরা মামলা দিয়েছি। অভিযান করেছি। কিন্তু জরিপ সংশোধন এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া নগরের পাহাড় রক্ষা করা কঠিন।’
২০০ পাহাড় বিলীন: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সিরাজুল হকের ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘হিল কাটিং ইন অ্যারাউন্ড চিটাগং সিটি’ শীর্ষক এক গবেষণায় দেখা যায়, চট্টগ্রামে স্বাধীনতার পর ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৮৮টি পাহাড় সম্পূর্ণ এবং ৯৫টি আংশিক কাটা হয়। সব মিলিয়ে ২ শতাধিক পাহাড় এখন অস্তিত্বহীন। ১৯৭৬ সালে নগরের পাঁচ থানা এলাকায় পাহাড় ছিল ৩২ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে তা কমে হয় ১৪ দশমিক শূন্য ২ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ৩৩ বছরে পাহাড় কাটা হয়েছে ১৮ দশমিক ৩৫ বর্গকিলোমিটার।



