চার বছরেই বিলীন ২৯৪ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ
- ৩৭ কিলোমিটারের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ মাত্র ৯ কিলোমিটার
- ঝুঁকিতে সাড়ে ১৫ হাজার হেক্টর এলাকা, ঘর-বাড়ি, দোকান ও হাসপাতাল
- ১১ হাজার ব্লকের মধ্যে সাড়ে তিন হাজারই নিম্নমানের, বলেছিল বুয়েট

ছবি: আগামীর সময়
ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁশখালী উপকূলের মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধ সংস্কার করেছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। চার বছর পার হতেই সেই বাঁধ বিলীন হয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে। এখন ঝড়ো হাওয়া বা ভারী বৃষ্টি হলেই আতঙ্কে দিন কাটছে উপকূলের কয়েক লাখ মানুষের।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, সঠিক নকশায় বাঁধ তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এটি টেকসই হয়নি। তবে পাউবোর দাবি, আদর্শ নকশায় বাঁধ বানাতে যে ব্যয় দরকার, সরকার তা দিতে নারাজ। ভাঙনের জন্য প্রাকৃতিক কারণই দায়ী। নকশায় কোনো ত্রুটি নেই।
তবে বাঁধ ভাঙনের কারণ অনুসন্ধান ও টেকসই সমাধান সংক্রান্ত একাধিক গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, বাঁধ নির্মাণের সময় মাটি যথাযথ কম্প্যাকশন না করা ও ইঁদুর বা কাঁকড়ার তৈরি গর্ত দিয়ে পানি চুইয়ে ঢোকাও বাঁধ ভাঙনের অন্যতম কারণ। টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য যেসব বিষয় গবেষকরা বিবেচনায় নিতে বলছেন, তার মধ্যে রয়েছে- উপকূলীয় বাঁধগুলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় কতটা স্থিতিশীল থাকবে তা যাচাই করা। জলোচ্ছ্বাস বা বড় ঢেউয়ের সময় পানি যেন বাঁধ উপচে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বাঁধের সঠিক উচ্চতা নির্ধারণ করা। বাঁধের ওপর সমুদ্রের পানির ধাক্কা বা চাপের (থ্রাস্ট ফোর্স) পরিমাণ কতটা হতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে বাঁধের নকশা করা।
আইএমইডির প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন অনুযায়ী, `পোল্ডার নং ৬৪/১এ, ৬৪/১বি ও ৬৪/১সি-এর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্বাসন' প্রকল্প ২০১৫ সালের মে মাসে শুরু হয়ে শেষ হয় ২০২২ সালের জুনে। এর আওতায় সিসি ব্লক দিয়ে ১০ কিলোমিটার ঢাল সংরক্ষণ, দুই কিলোমিটার বাঁধ পুনর্গঠন ও সাঙ্গু নদী তীরে সাড়ে তিন কিলোমিটার সুরক্ষা কাজ হয়। লক্ষ্য ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৯০১ হেক্টর এলাকা রক্ষা করা।
পাউবোর তথ্যমতে, বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া থেকে ছনুয়া পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে স্থায়ী বাঁধ মাত্র ৯ কিলোমিটার। বাকি ২৮ কিলোমিটারই অরক্ষিত। মাটির বাঁধ। আইএমইডির প্রতিবেদনে বাঁধের উচ্চতা ৭ দশমিক ২০ থেকে ৯ মিটার করার কথা বলা হলেও তা হয়নি। নির্মাণকাজ চলাকালেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ২০২০ সালে বুয়েট ১১ হাজার ৩৬টি ব্লক পরীক্ষা করে ৩ হাজার ৭৮৭টিকে অত্যন্ত নিম্নমানের চিহ্নিত করে বাতিলের সুপারিশ করেছিল।
গত শনিবার খানখানাবাদের প্রেমাশিয়া ও কদমরসুল ঘুরে দেখা যায় ভয়াবহ ভাঙনচিত্র। সিসি ব্লক ধসে পড়ে বালুচরে স্তূপ হয়ে আছে। ভাঙন ঠেকাতে ফেলা জিও-ব্যাগ ছিঁড়ে বালু উন্মুক্ত। অক্ষত অংশেও গভীর ফাটল। সবচেয়ে ভয়াবহ ভাঙন প্রেমাশিয়া ও খানখানাবাদ ভূমি অফিসের পশ্চিমে। যেখানে বাঁধের মাত্র এক-দেড় ফুট টিকে আছে। ফেলা বালুর বস্তাও তলিয়ে যাচ্ছে সাগরে। কদমরসুলের হাছিয়াপাড়ায় ব্লকের চিহ্নই নেই। বড় মাওলানা মাজার এলাকায় সৈকতের বালি আর বাঁধ প্রায় সমান উচ্চতায়। আজিম উদ্দিন মাওলানা বাড়ি ও কালা গাজীপাড়ায়ও বাঁধের সামান্য অংশ অবশিষ্ট। রত্নপুরের হালিয়াপাড়ায় নতুন কাজই হয়নি। আছে শুধু দুর্বল পুরোনো বাঁধ।
খানখানাবাদ ইউনিয়নের ডোংরার বাসিন্দা মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম বললেন, ‘বাঁধটি তৈরি আগে দীর্ঘদিন লবন পানির জন্য চাষাবাদ করতে পারিনি। এটি দুইবছরও টিকেনি। এখন বাঁধ নিয়ে নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বন্যায় সবচেয়ে ভয়ে ছিলাম বাঁধ ভেঙে যাবে কি না, কারণ এমনিতেই সরু হয়ে গেছে। ভাঙলে কিছুই বাঁচানো যেত না।’ খানখানাবাদের মৎস্যজীবী মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বাঁধ ভাঙনে পাঁচবার ভিটেহারা হয়েছেন, বর্তমান আশ্রয়েও থাকেন আতঙ্কে।
বাঁধ ভেঙে ঝুঁকিতে পড়েছে ৪৪টি সেতু, ৫৭টি কালভার্ট, ৭ হাজার ১৬৭টি ঘরবাড়ি, ২৩১টি মসজিদ-মন্দির, ১৫টি মাদ্রাসা, ৩১টি স্কুল ভবন ও ৪৫টি স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টার। এ ছাড়া ২৪টি ইউপি ভবন, ১৮টি হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৯টি কৃষি গুদাম, ৫৫৩ কিলোমিটার সড়ক, ৪ হাজার ৬৬৬টি দোকান, ১২টি করাতকল এবং ৫ হাজার ৩৮০ একর কৃষিজমিও পড়েছে লবণাক্ততা ও প্লাবনের ঝুঁকিতে।
বাঁধ ভাঙনের কারণ অনুসন্ধান ও টেকসই সমাধান নিয়ে জাইকার পাইলট প্রকল্প, যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক জিওটেকনিক্যাল সম্মেলনে প্রকাশিত গবেষণা, বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের গবেষণা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিবেদন বলছে, বঙ্গোপসাগর উত্তর দিকে ক্রমশ সরু হয়ে প্লাবনভূমি কমে যাওয়ায় জলোচ্ছ্বাস আরও শক্তি নিয়ে আছড়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিয়মিত ঢেউয়ের আঘাত। জোয়ার-ভাটায় পানির ওঠানামা। লবণ পানির প্লাবন। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তন উপেক্ষা করে করা বাঁধের নকশা। বাঁধ টেকসই করতে কোস্টাল মডেলে ঢেউয়ের আঘাত হিসাব করে বাঁধ নির্মাণ, ঘাস-গাছ লাগানো ও আধুনিক ব্লক ব্যবহার করার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, ‘বেড়িবাঁধ ঠিকমতো ডিজাইন করেনি, সঠিক নকশায় তৈরি করেনি। এরপর রক্ষণাবেক্ষণও করেনি। যার ফলে কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়েই বাঁধ ভেঙে গেছে। এই প্রকল্পে যেসব কর্মকর্তা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নয়তো বেড়িবাঁধ বানাবে, আবার ভাঙবে।’
ষাটের দশকে নির্মিত অনেক বাঁধ এখনো টিকে থাকার উদাহরণ টেনে তিনি বলেছেন, ‘সঠিক নকশায় বাঁধ বানালে অর্ধশতাব্দীও টেকে।’
তবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ। তিনি বললেন, ‘সাঙ্গু নদীর মোহনায় দ্রুত ভৌগোলিক পরিবর্তন হচ্ছে, যার কারণে সমুদ্রতীরের বাঁধের সেট ব্যাক ডিস্ট্যান্স (তীর থেকে দূরত্ব) আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। মোহনায় বাঁধের তলদেশে অতিরিক্ত ক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে, যার জন্য বাঁধের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।’




