শুল্কমুক্ত সুবিধায় রপ্তানি
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের ভারতপরীক্ষা
- জানুয়ারি থেকে ভারতও পাচ্ছে শুল্কমুক্ত সুবিধা
- বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ বাড়তি ‘লিড টাইম’
- চার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ

ফাইল ছবি
ইউরোপের পোশাক বাজারে জানুয়ারি থেকে বদলাচ্ছে সমীকরণ। শুল্কমুক্ত সুবিধায় সেখানকার বাজারে পোশাক রপ্তানিতে এতদিন আধিপত্য ছিল বাংলাদেশের। তবে জানুয়ারি থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় সে বাজারে ঢুকছে ভারতও। দেশটি এরই মধ্যে নিজেদের রপ্তানি দ্বিগুণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।
বিপরীতে অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ দেখছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাড়তি ‘লিড টাইম’ (কোনো পণ্যের অর্ডার দেওয়ার মুহূর্ত থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত সময়কাল)। বাংলাদেশের কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতার কারণে এই জায়গাটিতেই এগিয়ে থাকবে ভারত।
ইউরোপের বাজারে ২৭ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করে শীর্ষে আছে চীন। শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়া উচ্চমূল্যের সিনথেটিক পণ্য সরবরাহ করেই বাজার দখলে রেখেছে দেশটি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ রপ্তানি করে সাড়ে ২২ শতাংশ। ইউরোপের সাধারণ পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ এখনো সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী। সাড়ে ১০ শতাংশ পোশাক রপ্তানি করে তৃতীয় স্থানে আছে তুরস্ক। এরপর চতুর্থ অবস্থানে ভারত। দেশটি ৫ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করে ইউরোপের বাজারে। ফলে রপ্তানির দিক থেকে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ ১৭ শতাংশ এগিয়ে।
তবে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হচ্ছে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ)। ফলে উচ্চ শুল্কের দেয়াল ভেঙে সরাসরি শূন্য শুল্কে ইউরোপে ঢুকবে ভারতীয় পণ্য। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে— বাংলাদেশ গত বছর মুল্কমুক্ত সুবিধায় যে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি করেছে, আগামীতে তা থাকবে কি না?
পোশাক খাতে চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগ্রুপ এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম বললেন, ‘সমান শুল্ক হলে অবশ্যই আমাদের রপ্তানি কমবে। কী পরিমাণ কমবে, সেটি সরকারের নীতিসহায়তা, পোশাক মালিকদের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পোশাক মালিকদের শ্রমদক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তিনির্ভরতায় মনোযোগ দিতে হবে। কম মূল্যে শ্রম কিন্তু আর বেশিদিন থাকছে না। ফলে আমাদের কাছে থাকা সস্তা শ্রম দিয়ে আগামীতে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না।’
এম এ সালামের পরামর্শ, ইউরোপের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা আগেভাগে শুরু করা উচিত। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সেই তিন বছরে আমরা কী করব, তার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জানুয়ারি থেকে সমান শুল্কে ইউরোপের বাজারে ঢুকতে গেলে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাড়তি লিড টাইম। দেশে তৈরি ওভেন কাপড় ও সিনথেটিক ফাইবারের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল চীন বা ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে একটি অর্ডার প্রস্তুত করে ইউরোপের ক্রেতার হাতে পৌঁছাতে গড়ে ৬০ থেকে ৮০ দিন সময় লাগে। তুলা থেকে সুতা ও কাপড় তৈরির পুরো ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ নিজেদের সক্ষমতা থাকায় ভারত কোনো ধরনের আমদানি জটিলতা ছাড়াই মাত্র ৩০ থেকে ৪০ দিনে ইউরোপে পণ্য পৌঁছে দিতে পারবে।
বাংলাদেশ উৎপাদিত পোশাক জাহাজে সরাসরি ইউরোপের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারে না। চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর, কলম্বো বন্দরে যায়, সেখান থেকে আরও বড় জাহাজে ইউরোপ পৌঁছে। বিপরীতে নিজেদের গভীর সমুদ্রবন্দর থাকায় ভারত সরাসরি ও কম সময়ে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারে। পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটিও বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের।
এর সঙ্গে যোগ দেশের গ্যাস-বিদ্যুতের চড়া দাম ও অনিয়মিত সরবরাহ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সম্প্রতি যোগ হওয়া পোশাক পণ্যের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার অন্যতম। লজিস্টিক খরচ বেশি থাকায় বাংলাদেশের চেয়ে অন্তত তিন-চার সপ্তাহ আগেই ইউরোপের শোরুমে পণ্য পৌঁছে দিতে পারবে ভারত। এতদিন বাংলাদেশ ১২ শতাংশ পণ্য শুল্ক সুবিধার কারণে সেটি পুষিয়ে নিতে পেরেছিল।
মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকরের পর ইউরোপের বাজারে ২০২৭ সালে ৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ভারত। এই পরিমাণ রপ্তানি করলে ইউরোপে তাদের বাজার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ১২ শতাংশে। বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, তুরস্ক— এসব দেশ শূন্য শুল্কে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারে। এই দেশগুলোতেই ভাগ বসাবে ভারত। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশের ঝুঁকিই বেশি।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানালেন, জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ত্রিমুখী সংকটে পড়বে এবং বড় চাপ সামলাতে হবে। আমেরিকায় উচ্চশুল্ক আরোপের কারণে চীনের পণ্য সস্তায় ইউরোপের বাজারে ঢুকছে। ভিয়েতনামও শূন্য শুল্কে ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করছে। জানুয়ারি থেকে যুক্ত হবে ভারত। এ অবস্থায় বাংলাদেশ প্রাইস কম্পিটিশনে পড়বে।
তার পরামর্শ, বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে এখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি আলোচনা চূড়ান্ত করতে হবে। বিকল্প দেশের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করা। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা। এলডিসি উত্তরণ না হওয়া পর্যন্ত একটি বিশেষায়িত কারিগরি টিম গঠন করে ঝুঁকি নিরূপণ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় এবং বৈশ্বিক সমস্যা সমাধান করা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও আঙ্কটাড যৌথ স্টাডিতে বলা হচ্ছে, ২০২৯ সালের পর ইউরোপে কোনো বাণিজ্য সুবিধা না থাকলে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যার আর্থিক ক্ষতি বার্ষিক প্রায় ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বড় চাপে পড়বে ওভেন খাতে— যেখানে শার্ট, মেয়েদের সুতির জামা আর মিশ্র কাপড়ের জ্যাকেট। এসব অর্ডার সরাসরি ভারতীয়দের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। ধাক্কা খাবে ভ্যালু-অ্যাডেড ফ্যাশন ও আধুনিক স্পোর্টসওয়্যার ক্যাটাগরির পণ্যও।
অবশ্য পোশাক রপ্তানিতে দীর্ঘ ঐতিহ্যের কারণে বাংলাদেশ এখনো কিছু সুবিধাজনক অবস্থানেও আছে। প্রতিদিন লাখ লাখ পিস সাধারণ টি-শার্ট ও বেসিক ওভেন দ্রুত বানিয়ে দেওয়ার বিশাল অবকাঠামো ও দক্ষ ম্যানেজমেন্টে বাংলাদেশের ধারেকাছেও কেউ নেই। বিশ্বের শীর্ষ ১০০ পরিবেশবান্ধব (লিড সার্টিফায়েড) কারখানার অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশে, যা ইউরোপের কড়া পরিবেশ ও টেকসই মানদণ্ডে এগিয়ে রাখে। বাংলাদেশের কাছে আছে সস্তা শ্রম। শ্রমিকের মাসিক মজুরিতে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে মাত্র ২০ থেকে ৪০ ডলার কম। ফলে হুট করেই যে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতে ধস নামবে, বিষয়টি এমন নয়। ধীরে ধীরে বাজার হারাবে বাংলাদেশ।
ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশকে প্রধানত চারটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে নিশ্চিত করার তাগাদা দিলেন পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, লিড টাইম ৩০ থেকে ৪০ দিনে নামিয়ে আনা যায়। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের আমলাতান্ত্রিক জট দূর করে সরাসরি ইউরোপে পণ্য পাঠানোর লজিস্টিকস খরচ ও সময় কমানো। তৃতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, যাতে কম খরচে দ্রুত নিখুঁত ও বৈচিত্র্যময় ফ্যাশন পণ্য বানানো যায়। চতুর্থত, সস্তা সুতির টি-শার্টের গণ্ডি পেরিয়ে স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও উচ্চমূল্যের ভ্যালু-অ্যাডেড পোশাকে নজর দেওয়া।



