ছেলের হাতে খুন হওয়া এক অভাগা বাবা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুই বছর আগে নিখোঁজ হন ৬০ বছর বয়সী মীর মজিবুর রহমান খান। তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানতে পারে, নিজের ঔরসজাত দুই ছেলের হাতে খুন হয়েছেন তিনি।
আট মাস আগে বড় ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, ছোট ছেলে খুন করে মজিবুরের লাশ গুম করেছেন। সর্বশেষ ছোট ছেলেকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে জন্মদাতা বাবাকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা।
সেই ছোট ছেলের দেওয়া তথ্যে নগরীর হালিশহরে একটি লাশেরও সন্ধান পেয়েছে পিবিআই। সেটি আদৌ মজিবুরের কি না, নিশ্চিত হতে আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হবে বলে জানালেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আজমগীর।
মীর মজিবুর রহমান খানের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বল গ্রামে। পেশায় বাবুর্চি মজিবুরের প্রথম স্ত্রী দুই ছেলে রেখে মারা যান। ৩০ বছর আগে মজিবুর তাদের বাঁশখালীতে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান ফটিকছড়ির শ্বশুরবাড়িতে। এক মেয়ে রেখে স্ত্রীও মারা যান।
পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) মর্জিনা আক্তার জানালেন, ২০২৪ সালের ৭ জুন নগরীর ঘাটফরহাদবেগ এলাকায় মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে এসে নিখোঁজ হয়েছিলেন মজিবুর। একমাস পর ৮ জুলাই কোতোয়ালী থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন সালমা। পাঁচমাস পর ৬ নভেম্বর বাবাকে অপহরণের অভিযোগে দুই সৎ ভাইয়ের নামে তিনি আদালতে মামলা করেন।
তদন্তে অপহরণের সত্যতা পেয়ে পিবিআই মামলাটি সরাসরি কোতোয়ালী থানায় এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন করে। আদালত আবেদন গ্রহণ করে আবার পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর বড় ছেলে আনোয়ার হোসেনকে (৪১) বাঁশখালীর চাম্বল থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আনোয়ার জানালেন, শৈশবে মা হারিয়ে তারা দুই ভাই অনাদরে-অবহেলায় বেড়ে ওঠেন। মজিবুর তাদের দুই ভাইয়ের কর্তব্য পালন করেননি কখনো। সর্বশেষ তাদের বঞ্চিত করে সব সম্পদ সৎ বোনের নামে লিখে দিচ্ছেন জানতে পেরে এক নারীকে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে বাবাকে হত্যা করেন।
আরও তদন্তের পর গত শনিবার (১৩ জুন) রাতে আনোয়ারের ছোট ভাই বেলাল হোসেনকে (৩৫) কর্ণফুলী থানার মইজ্জ্যারটেক থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। বেলালের তথ্যে পরদিন সকালে মীরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার স্ত্রীর ভগ্নিপতি আব্দুল জলিলকে। এরপরই পুরোপুরি রহস্যের জট খোলে।
রবিবার বেলাল হোসেন বাবাকে খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানালেন পিবিআই পরিদর্শক (মেট্রো) মোস্তাফিজুর রহমান। বললেন, ‘বেলাল তার বান্ধবীর মাধ্যমে বাবাকে ফাঁদে ফেলেন। ওই নারী প্রেমের অভিনয় করে মজিবুরকে ২০২৪ সালের ৭ জুন সকালে তার বাকলিয়ার বাসায় ডেকে নেন। সেখানে আগে থেকেই বেলাল ও জলিল ছিলেন। মজিবুর সেখানে যাবার পর তাকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করে ফেলা হয়। এরপর তাকে প্রথমে অটোরিকশায় ও পরে মাইক্রোবাসে নিয়ে নগরীর বিভিন্নস্থানে ঘোরাঘুরি করেন তারা।’
‘সন্ধ্যার পর নগরীর হালিশহর থানার আর্টিলারি সেন্টারের কাছে আউটার রিং রোডে নিয়ে মাইক্রোবাসের ভেতরে মজিবুরকে বেলাল ও জলিল মিলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর লাশ রাস্তার পাশে ঝোপের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে আসেন।’- যোগ করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
এসআই আজমগীরের ভাষ্য, আনোয়ার তার বাবাকে খুনের তথ্য দিলেও সেসময় লাশের সন্ধান দিতে পারেননি। বেলালের তথ্য অনুযায়ী লাশের সন্ধানে নেমে তারা জানতে পারেন ২০২৪ সালের ৯ জুন হালিশহর থানা পুলিশ অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। এসআই তীর্থঙ্কর দাশ থানায় হত্যা মামলা করে লাশ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করেন।
দেড় বছর তদন্তের পরও নিহতের নাম-পরিচয় না পেয়ে গত ৩০ জানুয়ারি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে ফেলেছিল পুলিশ। সেই লাশটি মজিবুরের ধরে নিয়ে এখন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য আদালতে আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন পিবিআই কর্মকর্তা আজমগীর।




