‘আইসিইউর জন্য ঘুরেছি, তবু কলিজাকে বাঁচাতে পারিনি’

জন্মদিনে বাবা সুবল দাশের সঙ্গে মেয়ে অনুশ্রী দাশ। ছবি : সংগৃহীত
‘মেয়েকে নিয়ে আমি পাগলের মতো এই হাসপাতাল ওই হাসপাতাল ঘুরেছি। মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, সার্জিস্কোপ, মা ও শিশু হাসপাতাল কোথাও আইসিইউ খালি পাইনি। শেষপর্যন্ত বাধ্য হয়ে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। তার পরও কলিজাকে বাঁচাতে পারিনি।’
সাত বছরের মেয়ে অনুশ্রী দাশকে হারিয়ে এভাবে আর্তনাদ করছিলেন সুবল চন্দ্র দাশ শুভ। তার ডেঙ্গু হয়েছিল।
গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে মারা যায় সে। রাতেই তাকে সীতাকুণ্ডের শংকর মঠের মহাশ্মশানে সৎকার করা হয়।
মেয়ের অসুস্থতার পর থেকে উদ্বিগ্ন ছিলেন বাবা সুবল। জ্বর আক্রান্ত হওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর অনুশ্রীকে প্রথম স্থানীয় এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সুবল বলেন, ‘মেয়ের পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো ছিল। কিন্তু মুখে খেতে পারছিল না। শুক্রবার তাকে ডায়াবেটিস হাসপাতালে ভর্তি করি। বিকেলে রিপোর্টে প্লাটিলেট কমে সাড়ে ২৩ হাজারে দাঁড়ায়। তখন ডাক্তাররা বললেন, তাকে শিশুদের আইসিইউতে ভর্তি করতে হবে।’
সুবল চন্দ্র মেয়েকে নিয়ে ডায়াবেটিস হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পড়েন আইসিইউর জন্য। তিন চারটি হাসপাতাল ঘুরেও তিনি আইসিইউ পাননি। পরে বাধ্য হয়ে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করায়।
সুবল বলেন, ‘ইমপেরিয়াল হাসপাতালের আইসিইউতে শুক্রবার রাত ১টার দিকে মেয়েকে দেখতে যাই। মেয়ে তখন আমাকে বলে বাবা আমি বাসায় যাব।’
সুবল অনুশ্রীকে হাসপাতালে ভর্তির আগে থেকে সময়ে সময়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে মেয়ের জন্য আশীর্বাদ চেয়েছিলেন। শুক্রবার রাতে পৌনে ১টায় একটি পোস্টে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার কাছে মেয়েকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছিলেন।
তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মেয়ে ডেঙ্গুতে এমনভাবে আক্রান্ত হয়েছে যে খুব কষ্ট পাচ্ছে ডাক্তারেরা ভরসা দিচ্ছে না। যাদের বাসায় পূজার আসন আছে, আর যারা আমার মুসলিম ভাই-বোনেরা আছেন সবার কাছে হাতজোড় করে বলছি আমার অনুশ্রীর জন্য আশীর্বাদ করবেন। মুসলিম ভাইয়েরা মসজিদে গিয়ে দোয়া করবেন মেয়েকে এমন ভাবে দেখে কষ্টে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে।’
শনিবার সকাল থেকে অনুশ্রীর অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। তার লিভার, কিডনি সবকিছু আক্রান্ত হয়।
সুবল বলেন, ‘চিকিৎসকেরা দুপুরে ডেকে বলেন, তাকে লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে। আমি বুঝতে পারলাম আমার মেয়ে চলে যাচ্ছে।’
শনিবার বেলা ৩টা ২২ মিনিটে সুবল চন্দ্র দাশ আবার স্ট্যাটাস দেন, ‘আমার অনুশ্রী লাইফ সাপোর্টে।’
দুই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় সুবল মেয়ের মৃত্যুসংবাদ সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরেন, ‘আমার মেয়ে অনুশ্রী আর নেই।’
দিবাগত রাত পৌনে ৪টায় মেয়ের শেষযাত্রার ছবি দিয়ে সুবল আবার লিখেন, ‘আমার মামণি অনুশ্রীকে কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম বাবার কত আদরের মেয়ে ছিল ঈশ্বরের চরণে শেষ বিদায় দিয়ে আসলাম।‘
সুবল-লিপি দম্পতির দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে অনুশ্রী ছিল ছোট। পাহাড়তলী কিন্ডার গার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত সে। ২ আগস্ট ধুমধাম করে অনুশ্রীর জন্মদিন পালন করা হয়। সেই ছবি সুবলের ফেসবুকে স্মৃতি হয়ে আছে আজ।
সুবল বলেন, ‘শনিবার দুপুরে লাইফ সাপোর্টে দেওয়ার আগে মেয়ে অনেক কষ্টে আমাকে শুধু বলেছে, বাবা আমি বাসায় যাব। ‘ভাই আমার কলিজা চলে গেছে। আমার কলিজাকে আমি শত চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি।’




