জয়ের আনন্দে উৎসবের রাত

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পর্দা টানিয়ে দলবেঁধে আর্জেন্টিনার খেলা দেখছেন ভক্তরা। ছবি: আগামীর সময়
বিশ্বকাপের প্রতিটি খেলা ঘিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায় প্রাণের উচ্ছ্বাস। বড় দল বিশেষ করে আর্জেন্টিনা হলে তো কথাই নেই। বুধবার রাতেও আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে উত্তেজনার কমতি ছিল না। রাত ১ টায় খেলা হলেও ১১ টা থেকেই শহীদ মিনারে বড় পর্দার সামনে ভিড়। রাত গভীর হয়েছে যত, ততই যেন জেগে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়।
উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ছাপিয়ে প্রিয় দলের জয়ে আনন্দে হেসেছে ক্যাম্পাস। উৎসবে মাতোয়ারা ছিল ছাত্র-ছাত্রীরা। একই প্রাণের স্পন্দন দেখা গেছে পুরো নগরজুড়ে। প্রতিটি বড় সড়ক, অলিগলিতে ছিল জটলা। বড় পর্দা টানিয়ে দলবেঁধে দেখেছে আর্জেন্টিনার খেলা। দর্শকদের বড় একটি অংশ ছিল এই দলটির সমর্থক। বিপক্ষে মানে ইংলিশদের সমর্থকও ছিল কিছু। তবে তারা যত না ইংল্যান্ডের সমর্থক তার চেয়ে বেশি ছিল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবস্থান।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আরেকটি ফাইনালে পৌঁছাতে পারবে কি না- এই আলোচনা ছিল কেবল বুধবার রাতে খেলা শুরুর আগ পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পর্দার সামনে কেউ হাতে আকাশি-সাদা পতাকা, কেউ মেসির ১০ নম্বর জার্সি গায়ে, আবার কেউ বন্ধুদের কাঁধে হাত রেখে প্রার্থনা করেছেন— ‘একবার শুধু জিতে যাক আর্জেন্টিনা।’
আটলান্টার স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ম্যাচের উত্তাপ যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুরু থেকেই ছিল রুদ্ধশ্বাস লড়াই। মাঝমাঠের দখল, শক্ত ট্যাকল আর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে সেমিফাইনালের মহারণ। প্রথমার্ধ গোলশূন্য শেষ হলেও দুই দলের লড়াইয়ে এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ সরাতে পারেননি দর্শকরা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যখন আর্জেন্টিনা পিছিয়ে পড়ে তখন পুরো ক্যাম্পাস কিংবা চট্টগ্রাম শহরজুড়ে নীরবতা। উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা সমর্থকদের। কিছুক্ষণ আগেও যে ক্যাম্পাস কিংবা শহরের অলিগলি থেকে চিৎকার ভেসে আসছিল সেখানে নীরবতা। কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন, কেউ দুই হাত তুলে প্রার্থনায় মগ্ন হন।
শেষের দিকে সমতা ফেরানো গোলে প্রাণ ফিরে আসে সবখানে। শহর বা ক্যাম্পাস মেতে ওঠে আবার। আর্জেন্টিনার সমর্থক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বললেন, ‘এনজোর গোলের পর মনে হচ্ছিল ম্যাচটা আমাদের হাতেই চলে এসেছে। তখন আর বসে থাকতে পারিনি, সবাইকে জড়িয়ে ধরেছি। নেচেছি।’
করতালি, হর্ষধ্বনি আর ‘আর্জেন্টিনা... আর্জেন্টিনা..মেসি মেসি.’ স্লোগানে কেঁপে ওঠে পুরো চত্বর। আবেগ আর উত্তেজনায় মাখামাখি সবাই। খেলা কি তাহলে অতিরিক্ত সময়ে যাবে- এমন জল্পনা কল্পনা। অবশেষে ম্যাচের যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক গোল। হর্ষধ্বনী ওঠে সব জায়গা থেকে। রাতের নীরবতা ভেঙে অর্জেন্টিনার সমর্থকেরা আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন। কি ক্যাম্পাস কি শহর। সবখানে স্লোগান, আনন্দ র্যালি আর উল্লাস।
বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ মেসির নাম ধরে স্লোগান দিয়েছেন। আকাশি-সাদা পতাকা উড়েছে রাতের বাতাসে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি কোণ যেন পরিণত হয় ক্ষুদ্র এক বুয়েনস আইরেসে।
সমাজবিজ্ঞানে ছাত্র মেসি ভক্ত সোহরাব আবদুল্লাহ বললেন, ‘শেষ ৭ মিনিটে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন জীবনে খুব কমই দেখেছি। মনে হচ্ছিল সব শেষ, অথচ মেসি আবারও দেখিয়ে দিলেন কেন তিনি ইতিহাসের সেরা। রাতজাগাটা সার্থক হয়েছে।’
এই নির্ঘুম রাত আবারও জানিয়ে দিল, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস আর ভালোবাসার আরেক নাম। আর সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসি যেন আবারও লিখলেন বিশ্বকাপের নতুন এক মহাকাব্য।






