অনিলের ‘অন্তর্ধান’ নিয়ে ধূম্রজাল, চাপে পুলিশ

অনিল মুখার্জি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া ছবি
চট্টগ্রাম নগরীতে অনিল মুখার্জি নামে এক ব্যক্তির ছয় দিন ধরে নিখোঁজ থাকা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও না পেয়ে পুলিশের সন্দেহ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে তিনি নিজেই ‘অন্তর্ধান’ হয়েছেন। এ বিষয়ে অনিলের ভাই ও স্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যেও অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
জানা গেল, গত ২৯ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে নগরীর চকবাজার থানার মেহেদিবাগ এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে অনিল আর ফেরেননি। পরদিন তার স্ত্রী পূরবী মুখার্জি চকবাজার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর ঘটনাটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ছয় দিনেও খোঁজ না পাওয়ায় পুলিশের সমালোচনায় সরব হয়েছেন অনেকে।
নগরীর মেহেদিবাগে ‘প্রাচীর এল রহমান টাওয়ার’ নামে একটি ভবনে অনিল মুখার্জির (৪০) বাসা। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন। বাড়ি আনোয়ারা উপজেলায়। বাবা জহর মুখার্জি ও মা দীপা মুখার্জি। বাবা-মা আরেক ভাই নোবেল মুখার্জির সঙ্গে অন্য বাসায় থাকেন।
পরিবারের সদস্যরা জানালেন, অনিল স্মার্ট জ্যাকেট নামে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করলেও কয়েক বছর আগে সেটা ছেড়ে দেন। এরপর তিনি নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় তার মায়ের প্রতিষ্ঠিত ‘দীপালয় অটিজম চিলড্রেন একাডেমি’ পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন বলে জানালেন স্ত্রী পূরবী। তার ভাই নোবেল মুখার্জি অবশ্য দাবি করলেন, পোশাক কারখানার চাকরি ছাড়ার পর অনিল ‘ছোট’ ব্যবসা করতেন।
স্ত্রী পূরবী মুখার্জি আগামীর সময়কে জানালেন, ২৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় অনিল বাসা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে যান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরীর রহমতগঞ্জের কুসুমকুমারি সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে তার এক বন্ধু তাকে রিকশায় তুলে দেন। বাসার উদ্দেশে রিকশা নিয়ে রওনা দিলেও তিনি আর বাসায় ফেরেননি। তবে রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাসার গলিতে তাকে দেখা গেছে বলে ভবনের নিরাপত্তারক্ষী তাদের জানান।
‘দারোয়ানের কথা শুনে আমরা বিল্ডিংয়ের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করি। অনিলকে গলির ভেতরে দেখা গেছে। এরপর পুলিশ আরও ফুটেজ সংগ্রহ করে। সেখানে তাকে দুই হাতে দুইটা ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। অথচ বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সে কোনো ব্যাগ নেয়নি। বাসা থেকে বের হয়েছিল খয়েরি রঙের টিশার্ট পরে। ফুটেজে দেখা গেছে সে কালো রঙের টিশার্ট পরে আছে। সে বাসায়ও আসেনি। তাহলে ব্যাগ কোথায় পেল কিংবা পোশাক কোথায় চেঞ্জ করল এটা আমরাও বুঝতে পারছি না।’
অনিল তার ব্যক্তিগত মোবাইল বাসায় রেখে গেছেন বলে জানালেন চকবাজার থানার ওসি নুর হোসেন মামুন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুই হাতে দুইটা ব্যাগ নিয়ে গলি দিয়ে বের হতে দেখা গেছে। রাত ২টার দিকে রাস্তায় হেঁটে যেতেও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। এরপর তাকে আর শনাক্ত করা যায়নি। মোবাইল সঙ্গে নিয়ে গেলে আমরা দ্রুত অবস্থান শনাক্ত করতে পারতাম। উনি স্বেচ্ছায় বাসা থেকে বের হয়ে চলে গেছেন। এমন না যে উনাকে বাসা থেকে কেউ তুলে নিয়ে গেছেন। আমাদের ধারণা, পরিবারের সদস্যদের কারও সঙ্গে উনার মনোমালিন্য হয়েছিল। এজন্য উনি বাসা ছেড়েছেন।’
পূরবী মুখার্জি বললেন, ‘আমার সঙ্গে কোনো ঝগড়া হয়নি। ফ্যামিলির অন্য কারও সঙ্গে হালকা সমস্যা ছিল। সে তো খুব চাপা স্বভাবের ছিল। কিছুই পরিস্কার করে বলত না। ভাই কিংবা মায়ের সঙ্গে ঝামেলার কথা মাঝে একবার বলেছিল। ঘটনার দিন আমার বাসায় গেস্ট ছিল। সে কারণে আমি রক্ষা পেয়েছি। না হলে সবাই ভাবত আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে গেছে।’
ভাই নোবেল মুখার্জি বললেন, ‘আমার সঙ্গে কোনো মনোমালিন্য ছিল না। আমরা আলাদা থাকি। আমার ভাই আলাদা থাকেন। আমার বৌদিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বলেছেন উনার সঙ্গেও কোনো সমস্যা হয়নি। আর টুকটাক হলেও এগুলো তো সব ফ্যামিলিতে থাকে। সেজন্য কি ঘর থেকে বের হয়ে যেতে হবে ? আমার ভাই খুবই ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের। ইগো প্রবেলম ছিল। মনের কথা কাউকে খুলে বলত না।’
নোবেল অবশ্য ছয় দিন ধরে ভাইকে খুঁজে না পাওয়ার জন্য পুলিশকে দায়ী করেন। বললেন, ‘আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ কালেক্ট করে পুলিশকে দিচ্ছি। পুলিশ নিজ থেকে কিছুই করছে না। পুলিশের গাফিলতি আছে। একটা মানুষ তো উধাও হয়ে যেতে পারে না। তার খোঁজ বের করা কি পুলিশের দায়িত্ব নয় !’
ওসি নুর হোসেন মামুন বললেন, ‘এ ঘটনা নিয়ে খুব প্রেশারে আছি। মেয়র (চসিক প্রশাসক) সাহেব ফোন করে বললেন তাকে (অনিল) খুঁজে বের করতে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমি টায়ার্ড। পুরো শহরের অলমোস্ট সব ক্যামেরার ফুটেজ মনে হয় চেক করা হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষের মধ্যে কোথায় খুঁজে পাব! বের হয়েছে রাতের আঁধারে। মোবাইলও নেয়নি। পরিবারের লোকজনই তো তথ্য দিতে পারবে যে সম্ভাব্য কোথায় যেতে পারেন। কিন্তু উনাদের কাছেও তো এমন কোনো তথ্য নেই।’



