পাড়ার সুনীল সেলাই করতেন আশীষ-আসলাম-কামালদের প্যান্ট

অরবিট টেইলার্সের মালিক সুনীল কান্তি দে
চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম থেকে দূরত্ব পৌনে এক কিলোমিটার। বিখ্যাত আসকারদিঘির পশ্চিম পাড়ে একটি ছোট্ট দোকান। উপরে টিন, পাশে বাঁশের বেড়া। দোকানে থরে থরে সাজানো থাকতো ফুটবলারদের জার্সি ও প্যান্ট। নাম অরবিট টেইলার্স।
আগে দোকানের সাইনবোর্ড ছিল। পরে ঝড়ে উড়ে গেছে। এরকম ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ দোকানটিতে একসময় পা পড়েছিল নামিদামি ফুটবলাদের। আশীষ ভদ্র, শেখ আসলাম, টুটুল, এফ আই কামাল, সাব্বির আরও অনেকে। প্রায় ৪০ বছর আগে তারা ছিলেন জাতীয় ফুটবল দলের তারকা।
দোকানের মালিক সুনীল কান্তি দে। সত্তর, আশির দশকের এত এত তারকা ফুটবলার দোকানটিতে এসে বসে থাকতেন নিজের অর্ডার করা প্যান্টের জন্য। দোকানটিতে দেশের নামকরা এত ফুটবলারদের ভিড় হওয়ার একটাই কারণ-নিখুঁত সেলাই ও ফিটিং। তখনকার সেই সেলাই মেশিনটি নিয়ে এখনও পুরনো স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন সুনীল। আয়ও নেই আগের মতো। এ নিয়ে আক্ষেপও নেই তার।
পুরোনো সেই দিনের কথা তুলতেই সত্তরোর্ধ্ব সুনীলের চোখেমুখে আলোর আভা। ফিরে যান সেই সোনালি অতীতে, যখন ফুটবল ছিল দেশের কোটি মানুষের বিনোদনের বড় ইভেন্ট। ‘তখন ফুটবলের উন্মাদনা চারদিকে। ক্লাব ফুটবল, চট্টগ্রাম ও ঢাকার লিগ মানে আবেগ-উত্তেজনায় ভরা। আমার ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ছিল। হালিশহরে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলতাম। ওখানকার দু একজন পরে স্টিল মিল দলে খেলেছে’, সুনীলের স্মৃতিচারণ।
মধ্যম হালিশহরে জন্ম নেওয়া সুনীল দে ১৯৭৭ সালের দিকে আসকারদিঘির পশ্চিম পাড়ে টেইলার্সের দোকান খুলে বসেন। অরবিট নামটি ঠিক করে দেন তার পরিচিত একজন। ওই লোকের নাম এখন মনে নেই সুনীলের। এর আগে হালিশহরে জালাল উদ্দিন নামে একজনের অধীনে টেইলারিং কাজ শিখেছেন। মাঝখানে কক্ষচ্যুত হয়ে কিছুদিন মোটরপার্টসের দোকান করেছিলেন বারিক বিল্ডিং মোড়ে। এর পর অরবিট টেইলার্সের মাধ্যমে আবারও ফিরে আসেন সেলাইয়ের পেশায়, যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় বলা হয় দর্জি।
সুনীল বললেন, ‘সত্তরের দশকের শেষ দিকে স্টিল মিল দলের কয়েকজনের প্যান্ট সেলাই করি। তাদের মধ্যে ছিলেন সুবাস দাশ, নিরঞ্জন চক্রবর্তীরা। এ ছাড়া আসকারদিঘির পাড়ে থাকা প্লেয়ারদের প্যান্টও নিয়মিত সেলাই করতাম। এভাবে একসময় নাম হয়ে যায়। তখন বড় বড় প্লেয়াররা আসতে শুরু করেন। শাহেদ আজগর চৌধুরীর স্টার ক্লাবের শটর্স বানিয়ে বেশি নামডাক হয়।’
তখন চট্টগ্রামে প্রথম বিভাগ ও দ্বিতীয় বিভাগের জমজমাট ফুটবল লিগ হতো। ওই লিগে খেলতে আসতেন ঢাকার ফুটবলাররা। আসলাম, এফ আই কামাল, আশীষ ভদ্র, সত্যজিত দাস রূপু আরও পরে সাব্বিরের মতো তারকারা।
সুনীলের ভাষ্য, ‘একদিন ঢাকা থেকে একটি প্যান্ট নিয়ে এলেন আশীষ ভদ্র। ওটা ফিট হচ্ছিল না তার। কিন্তু আমি পারব কিনা তা নিয়ে তার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। সেটা করে দেওয়ার পর ফিটিং দেখে খুশি হলেন। এরপর তার অনেক প্যান্ট সেলাই করেছি।’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আশীষ ভদ্র কিংবা এফ আই কামালদের মনে এখনো উজ্জ্বল উপস্থিতি অরবিটের সুনীলের নাম। আশীষ ভদ্র জানালেন, বেশ ট্যালেন্ট ছিলেন সুনীল। একজন দুজনের প্যান্ট সেলাই করতে করতে তার অনেক নামডাক হয়ে যায়। তখন ফুটবল কিংবা অন্যান্য খেলার প্যান্ট, ট্রাউজার মানেই অরবিট।
একই সময়ে ঢাকার ফুটবলারদের সেলাই ঘর ছিল ঢাকা স্টেডিয়াম মার্কেটের সিরাজ টেইলার্স। কিন্তু ওখানে ভিড় হয়ে যেত। এর বিকল্প হিসেবে চট্টগ্রামে সুনীলের নাম ছড়িয়ে পড়ে বলে জানান তখনকার ফুটবলাররা।
একসময় কত গিয়েছি ওই দোকানে। তার মতো প্যান্ট কেউ সেলাই করতে পারতো না চট্টগ্রামে। দারুণ ফিটিংস।
চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম সংলগ্ন আসকারদিঘির পাড়। বলা যায় অনেকটা স্টেডিয়াম পাড়া। ওই পাড়ার জাতীয় দলের ফুটবলার টিপু, গোলরক্ষক খোকন, বাবুল দেব, মাহবুবরা একসময় নিয়মিত খেলতেন লিগে। তাদের মাধ্যমেও ফুটবলাররা আসতেন সুনীলের দোকানে।
জাতীয় দলের সাবেক আরেক তারকা এফআই কামাল। সুনীল দে এবং অরবিট টেইলার্স এখনও আছে শুনে নষ্টালজিক হয়ে পড়লেন, ‘একসময় কত গিয়েছি ওই দোকানে। তার মতো প্যান্ট কেউ সেলাই করতে পারতো না চট্টগ্রামে। দারুণ ফিটিংস।’
তবে এত এত সুনামের মাঝে সুনীলের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ সঠিক সময়ে ডেলিভারি দিতে না পারা। সেটির ভুক্তভোগী এফ আই কামালও। শুধু সেলাই নয়, খেলোয়াড়দের সঙ্গে আড্ডায়ও মেতে থাকতেন সুনীল। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল তার। এফ আই কামালের কথা উঠতেই সুনীল বললেন, ‘তিনি চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম) হাইস্কুল থেকে চট্টগ্রামে আসেন। তারপর লিগে খেলতেন। দুর্দান্ত প্লেয়ার ছিলেন।’
শেখ আসলাম, জনি, মুন্না, চুন্নুদের প্যান্টও বানিয়েছেন সুনীল। তখন আসলাম চট্টগ্রাম কাস্টমসে খেলতেন। সবার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে টিকিট লাগতো না সুনীলের। রয়েছে মজার স্মৃতিও। বললেন, ‘একবার চট্টগ্রাম মোহামেডানে বিদেশী একজন খেলবেন। তখন ঢাকায় খেলছেন তিনি। আমাকে বলা হলো টিভিতে দেখে তার মাপে প্যান্ট বানাতে। কারণ সময় কম। বানিয়ে ফেললাম। এভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক। আমি প্যাভিলিয়নে বসে খেলা দেখতাম। টিকিট লাগতো না। খেলোয়াড়রা বলে দিতেন গেট কিপারদের।’
বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনার সমর্থক সুনীল দে এখনো অরবিট টেইলার্সে বসে সেলাইকাজ করেন। তবে ফুটবলের আকালের মতো শটর্স বা ট্রাউজার তৈরির তাগিদও নেই। ভাঙাচোরা দোকানে বসে অতীতের স্মৃতি হাতড়ে দেশের ফুটবলের জন্য আফসোস করেন সুনীল, ‘৯০-৯৫ সালের পর ফুটবল শেষ। অথচ কী এক জমজমাট উন্মাদনা ছিল তখন।’







