সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে বন্দর ছাড়ল ‘বক্স এনডেভার’ জাহাজ

সংগৃহীত ছবি
সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়ল বিদেশি ‘বক্স এনডেভার’ কনটেইনার জাহাজ। জাহাজটি এক হাজারের বেশি রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার নিয়ে গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকাল সাড়ে চারটায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ছাড়ে। আগামীকাল এই জাহাজ মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাঙ-এ পৌঁছাবে।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকালে জাহাজটিকে নিরাপদে বহির্নোঙরে পৌঁছে দেওয়ার পর মই বেয়ে নিচে নামার মুহূর্তে ম্যানরোপ (মইয়ের দুপাশে থাকা দড়ি) ছিঁড়ে পড়ে যান পাইলট ক্যাপ্টেন রবিউজ্জামান। অল্পের জন্য তিনি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেও ডান হাত ও পিঠে মারাত্মক জখম হন। সেদিন এই ঘটনার ছবিসহ প্রথম সংবাদ প্রকাশ করে আগামীর সময়।
এ ঘটনার পর জাহাজ আটক করে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি জাহাজ সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ১৫ গুরুতর ত্রুটি পায়। এরপরই জাহাজকে জরিমানা করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির রিপোর্টও ছাপে আগামীর সময়।
জরিমানা নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ লুকোচুরি খেলেছে। বন্দর চেয়েছিল নামমাত্র জরিমানা করে ‘বক্স এনডেভার’ জাহাজটি ছেড়ে দিতে। জাহাজের শিপিং এজেন্ট কন্টিনেন্টাল গ্রুপের কন্টিনেন্টাল ট্রেডার্স বেশ তদবিরও করেছিল। কিন্তু আগামীর সময়ের প্রতিবেদনের কারণে শেষপর্যন্ত সেই ‘অবৈধ সমঝোতা’র পথে হাঁটতে পারেনি বন্দর। ৩০ লাখ টাকা জরিমানা, সঙ্গে সাড়ে ৪ লাখ টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়েই জাহাজ বন্দর ছাড়তে বাধ্য হয়।
কন্টিনেন্টাল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান ইকবাল চৌধুরী জানিয়েছেন, ভ্যাটসহ সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা পরিশোধ করে বন্দর ছেড়েছে জাহাজটি।
চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম ফোনে সাড়া না দেওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
জাহাজে নাবিকদের থাকার জায়গায় জরুরি ফায়ার হাইড্রেন্ট ভালভ পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। ইঞ্জিন রুমের পোর্ট ও স্টারবোর্ড— উভয় পাশের ভেন্টিলেশন ফ্লাপ সঠিকভাবে বন্ধ হচ্ছিল না। এই ত্রুটির কারণে সাগরে চলমান অবস্থায় জাহাজে আগুন লাগলে বাতাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো যেত না। এতে বড় দুর্ঘটনা ঘটত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল কমিটি।
জাহাজে হেভি ফুয়েল অয়েল সেপারেটর ট্রের ওপর বিপজ্জনকভাবে তেল জমে ছিল। ফুয়েল ট্রান্সফার পাম্প, স্লাজ ট্যাংক এবং কুলিং পাম্পের গ্ল্যান্ড থেকে নিয়মিত তেল চুইয়ে পড়ার স্পষ্ট প্রমাণ পায় কমিটি। এ ছাড়া ইনসিনারেটর সেটলিং ট্যাংকের ট্রেতে তেল জমা এবং ফানেলে তেলের ঘন আস্তরণও পাওয়া যায়।
তদন্তে জাহাজের ড্রাফট মার্কগুলো অস্পষ্ট ছিল অর্থাৎ জাহাজে পণ্য বোঝাই থাকলে কী পরিমাণ ডুবে থাকত, তার চিহ্ন ছিল না। জাহাজের মাস্টার স্টেশন মার্কিং নাবিকদের তালিকার সঙ্গে মিল ছিল না বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ইঞ্জিন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কর্মীরা জাহাজের কার্গো হোল্ড স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনার বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তদন্ত কমিটি প্রশ্ন তুলেছে, জাহাজটি ‘লয়েডস রেজিস্ট্রার’ ক্লাসের মতো আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংস্থার সনদধারী এবং আধুনিক মানের হলেও, এর ফিলিপাইন বা বিদেশি ক্রুরা প্রাথমিক স্মোক ডিটেকশন সিস্টেম পরিচালনায় দক্ষ ছিলেন না।
এই ১৫ গুরুতর ত্রুটি সারিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর ছেড়েছে বলে দাবি করেছে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। বাস্তবে সেই ত্রুটি সারানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে রয়ে গেছে সংশয়।









