সাজ্জাদের তিন স্তরের নেটওয়ার্ক ভাঙার চেষ্টায় পুলিশ
- ‘গডফাদার’ সাজ্জাদকে টাচ করা জরুরি : এসপি

বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। ছবি : আগামীর সময়
‘সাজ্জাদ ভাইয়ের সব অটো মাল (উগ্র-একরোখা)। আমার মতো শত শত রায়হান তার স্টোরে পড়ে আছে।’ ‘সাধারণ মানুষ, প্রশাসন ও মিডিয়ার কোনো ভাইয়ের সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই আমার। নেই কোনো প্রতিযোগিতা। সব শেষে একটা কথা বলি— রায়হান রায়হান মিডিয়াতে জিকির না করে কাদের দ্বারা রায়হান তৈরি হয় তাদের আগে খুঁজে বের করুন।’
পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড বা শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা চট্টগ্রামের রাউজানের রায়হান আলমের গত ১৭ ও ২১ আগস্ট ফেসবুকে দেওয়া এ দুটি পোস্ট নজরে এসেছে বাহিনীর।
রায়হানের বক্তব্য এবং সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ও মোবারক হোসেন ওরফে ‘গলাকাটা’ মোবারক ওরফে ‘কালা’ মোবারকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ চট্টগ্রামের ভয়ংকর সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের ‘গডফাদার’। এ নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা নেই। দেশের বাইরে অবস্থান করেও পুরোপুরি ভাঙেনি তার প্রভাবের বলয়; বরং মাঠপর্যায়ে ডেভিড ইমন, রায়হান ও মোবারকদের মতো সশস্ত্র সহযোগীদের মাধ্যমে সেই নেটওয়ার্ক সক্রিয় ও চলমান। সাজ্জাদ তার নাম-পরিচয় বদলে আবদুল্লাহ নামে পাসপোর্ট ব্যবহার করেন এখন। কীভাবে কোন কৌশলে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন তার তথ্য সংগ্রহে নেমেছে পুলিশ।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বললেন, ‘গ্রেপ্তার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, এখানে অপরাধ জগতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন বড় সাজ্জাদ। বিদেশে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যা ইচ্ছা তা-ই করার চেষ্টা করছেন তিনি। এখন তাকে টাচ করাটা আমাদের জন্য জরুরি। কীভাবে করব, সেটা আমাদের পলিসি মেকিং লেভেলে যারা আছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে করব। বিদেশে আছেন বলে সাজ্জাদ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বিদেশে থাকুক আর আসমানে থাকুক, রাষ্ট্র যদি চায় তাকে নিয়ে আসতে পারবে।’
বড় সাজ্জাদের তিন স্তরের কাঠামো
গত ২৮ জুলাই যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত এলাকায় ধরা পড়েন মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। ২৬ আগস্ট বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্রসহ ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন ‘কালা’ মোবারক। পুলিশ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, ডেভিড ইমন ও মোবারককে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বড় সাজ্জাদের অপরাধ জগতের নেটওয়ার্কের ‘তিন স্তরের কাঠামোর’ চিত্র এখন তাদের সামনে। এক দল বড় সাজ্জাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে, আরেক দল সরাসরি হামলা বা অস্ত্র ব্যবহারে অংশ নেয়। অন্যরা ঘটনাস্থলের আশপাশে অবস্থান করে সহায়তা করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন বড় সাজ্জাদের হয়ে। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ডেভিড ইমন ও রায়হান। মোবারক ছিলেন ডেভিড ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড ও বাহিনীর প্রধান শুটার। আবার মোবারকের সঙ্গে বড় সাজ্জাদেরও সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এখন রায়হানকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্ক দুর্বল হবে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
জবাবে যা বলছেন বড় সাজ্জাদ
বরাবর ইমন-রায়হানদের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা অস্বীকার করে আসছেন বড় সাজ্জাদ। ২৮ আগস্ট রাতে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় আগামীর সময়ের এই প্রতিবেদকের। বিদেশে বসে চট্টগ্রামে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমি ৩০ বছর দেশের বাইরে। আমি কি নেলসন ম্যান্ডেলা যে ২৭ বছর কারাগারে থাকার পর বের হয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছি। আমার যদি এত ক্ষমতা থাকত, আমার নির্দেশে যদি এত ঘটনা ঘটে যেত, তাহলে দেশে পুলিশ লাগত না।’
গ্রেপ্তার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রসঙ্গে এসপির বক্তব্যের বিষয়ে সাজ্জাদের প্রতিক্রিয়া, ‘আমি যখন দেশ ছেড়েছি, তখন এসপি মাসুদ সাহেব চাকরিতেও জয়েন করেননি। ইমন, রায়হানদের চেহারাও আমি দেখিনি। তাদের জন্মের আগে আমি দেশ ছেড়েছি। এখন আমি কি একেবারে আল্লাহর অলি হয়ে গেছি যে, তারা না দেখেই আমার প্রেমে পড়ে যাবে, আমাকে মহব্বত করবে। আমি নির্দেশ দিলেই তারা একেবারে কাউকে খুন করে ফেলবে, আমার কি এত ক্ষমতা? ইজ ইট পসিবল?’
ইন্টারপোলে খোঁজখবর শুরু: এ প্রেক্ষাপটে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশনের (ইন্টারপোল) রেড নোটিসে থাকা বড় সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনা অথবা দেশে থাকা সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার কৌশল খুঁজছে পুলিশ। বড় সাজ্জাদ চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার চালিতাতলী এলাকার আবদুল গণি কন্ট্রাক্টরের ছেলে। ছিলেন বনেদি পরিবারের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করা মেধাবী সন্তান। নব্বইয়ের দশকে অপরাধ জগতে জড়ান।
একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাজ্জাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। র্যাবের ‘ক্রসফায়ারের যুগে’ ২০০৪ সালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়ে পালান দুবাই। পুলিশ জানায়, দুবাই থেকে ভারতে গিয়ে সেখানেই অবস্থান করছেন সাজ্জাদ। তার জীবনযাপনের খরচে জোগান দিচ্ছেন বাংলাদেশে থাকা বাহিনীর সদস্যরা। অপরাধ জগৎ থেকে হাতানো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয় তার কাছে।
২০১১ সালে বড় সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলে আবেদন করেন তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার তৎকালীন এসআই মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। ২০১২ সালের অক্টোবরে দুবাই যাওয়ার পথে ভারতের অমৃতসর বিমানবন্দর থেকে বড় সাজ্জাদকে আটক করে দেশটির পুলিশ। কিন্তু নাম-ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি এবং ‘অজ্ঞাত কারণে’ আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সবুজসংকেত না পাওয়ায় তাকে ফেরানো যায়নি বলে জানালেন সিএমপির সে সময়ের দুই কর্মকর্তা।
আবদুল্লাহ নামে পাসপোর্টের বিষয়ে জানতে চাইলে বড় সাজ্জাদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘এগুলো ১৫ বছর আগের কথা। নতুন কিছু খুঁজে না পেয়ে এসব কথা আবার বাজারে আনছে পুলিশ।’







