বাবা-ছেলে নিহত
‘ঘুম ভাঙল দুঃসংবাদের ফোনে’

দুর্গাপদের পুত্রবধূ আন্নি সেনের কান্না। ছবি: আগামীর সময়
‘দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরেছি রাত করে। বাবা ও দাদা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কথা হয়নি। আজ সকালে বাড়ি যাওয়ার কথা জানতাম। আমার ঘুম ভাঙল সকালে দুঃসংবাদের ফোনে’, আক্ষেপে পুড়ছিলেন হাজারি গলির ওষুধের দোকানি বাবলা মল্লিক। বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে শেষ কথাও হয়নি।
মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শাহ আমানত তৃতীয় সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে পিকআপের ধাক্কায় মারা যায় মোটরসাইকেল আরোহী বিধান মল্লিক (৪২) ও তার বাবা দুর্গাপদ মল্লিক (৭৫)। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরের সামনে আর্তনাদ করছিলেন বিধানের ছোট ভাই বাবলাসহ স্বজনরা।
বিধান দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। প্রতিদিন নগরের পাথরঘাটার বাসা থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে কোরিয়ান ইপিজেড সংলগ্ন স্কুলটিতে আসা যাওয়া করতেন। আজ বাবাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি আনোয়ারা উপজেলার সিংহরা যাচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টায় ঘর থেকে রওনা হন তারা।
যে তিন্নি কিছুক্ষণ আগে স্বামী ও শ্বশুরকে বিদায় দিয়েছিলেন তিনি কিছুতেই মানতে পারছিলেন না এমন মৃত্যু। বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে আসে হাসপাতালের পরিবেশ, ‘কেন আমার এমন সর্বনাশ হলো। আমার ছেলেমেয়েদের কে দেখবে?’
দুই মেয়ে এক ছেলের বাবা বিধান। বড় মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। ছেলের বয়স সাড়ে ৪ বছর। তারা তখনো বাসায়, জানে না তাদের বাবা, ঠাকুরদা আর নেই।
বাবলার স্ত্রী আন্নি সেন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘সকালে দুজন একসাথে হাসিমুখে ঘর থেকে বের হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এমন খবর। আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না।’
বিধান ১৪ বছর ধরে দৌলতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তার সহকর্মী দেবাশীষ সেন, মো. ইমরান ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। দেবাশীষের ভাষ্য, ‘কতবার তার মোটরসাইকেলে চড়ে স্কুলে যাওয়া আসা করেছি। কখনো বেপরোয়া চালাতেন না। কিন্তু আজ তাকে প্রাণ দিতে হলো।’
বাবলা কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না। ‘বাড়িতে একটা পূজা দেওয়ার কথা ছিল। এ জন্য বাবা ও দাদা যাচ্ছিলেন। তা আগে থেকেই জানতাম। বিকেলে ফিরে আসার কথা ছিল। আর ফিরল না।’
বিধানের মা স্বপ্না মল্লিকও স্বামী সন্তানের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন। তিনি শুধু বলছিলেন, ‘আমি ছেলে ও স্বামীকে না নিয়ে ঘরে যাবো না।’
দুজনের চিকিৎসা চলছে এমন সান্ত্বনা দিয়ে স্বজনেরা তাকে বাসায় পাঠিয়েছেন ছেলের স্ত্রী তিন্নির সঙ্গে। এক সড়ক দুর্ঘটনায় বউ শাশুড়ি দুজনেই বিধবা হলেন আজ।







