চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ: ‘নহে সামান্য নারী’

ছবি: আগামীর সময়
মণিপুর রাজ্যের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা ও মহাভারতের অর্জুনকে ঘিরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদার কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। নারীর আত্মমর্যাদা, রূপ ও গুণের দ্বন্দ্ব এবং প্রকৃত প্রেমের এক অনন্য সৃষ্টি রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা। তপস্যামগ্ন অর্জুন মণিপুর রাজ্যে পৌঁছে দেখেন রাজ্যের রাজা তার কন্যা চিত্রাঙ্গদাকে রণশিক্ষায় পারদর্শী করে পুত্রসম হিসেবে গড়ে তুলছেন। চিত্রাঙ্গদা অর্জুন-রূপে মুগ্ধ হন, প্রেমেও পড়েন। এর পর নানা উত্থান পতন।
রবীন্দ্রনাথের এই চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যটি মঞ্চে তুলে এনেছে অভ্যুদয় সংগীত অঙ্গন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে (টিআইসি) নৃত্যনাট্যের দুটি প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হলো। নৃত্যনাট্যের নির্দেশনা দিয়েছেন সংগীত শিল্পী শ্রেয়সী রায়। নৃত্যে ছিল নৃত্যরূপ একাডেমি। নৃত্য পরিচালনা করেন প্রিয়াংকা বড়ুয়া।
গান, নৃত্য এবং কথামালায় চিত্রাঙ্গদার কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয় মঞ্চে। সেই সঙ্গে ছিল চমৎকার আলোক প্রক্ষেপণ। আলো আঁধারির মাঝে অর্জুন প্রবেশ করেন। অর্জুন প্রেমে মোহিত হওয়ার পর চিত্রাঙ্গদার মধ্যে নারীত্বের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু অর্জুন তাকে যোদ্ধা হিসেবে দেখেন। সাধারণ নারীরূপের অনুপস্থিতিতে চিত্রাঙ্গদার প্রেম প্রত্যাখাত হয় অর্জুনের কাছে। তখন, চিত্রাঙ্গদার আকুতি, ‘অর্জুন, তুমি ফিরে এসো, ফিরে এসো, ক্ষমা দিয়ে করো না অসম্মান।’
প্রেমের জোয়ারে ভাসতে থাকা চিত্রাঙ্গদা ছাড়ার পাত্র নয়। নিজেকে নারীরূপে আবির্ভূত করার এক প্রয়াস তার মধ্যে গেঁথে যায়। মনের মধ্যে পুলকিত অনুরণন, ‘ওরে ঝড় নেমে আয় আয়, আয় রে আমার শুকনো পাতার ডালে এই বরষায় নবশ্যামের আগমনের কালে।’ কখনো গেয়ে ওঠেন বিরহের গীত। ‘বধূ কোন আলো লাগল চোখে...বুঝি দীপ্তিরূপে ছিলে সূর্যালোকে।’
চিত্রাঙ্গদার প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে তাকে মোহিনী রূপ দান করেন কামদেব। নতুন রূপে অর্জুন চিত্রাঙ্গদার প্রতি আকৃষ্ট হন, প্রেমে পড়েন। অর্জুন জানেন না এই নারীই মনিপুরের রাজকন্যা। চিত্রাঙ্গদাও নিজেকে গোপন রাখেন। অর্জুন প্রকৃতপক্ষে কাকে ভালোবাসেন চিত্রাঙ্গদার বাহ্যিক রূপ নাকি প্রকৃত অস্তিত্বকে।
চিত্রাঙ্গদা গেয়ে ওঠেন ‘আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়, ‘বাজায় বাঁশি/ আনন্দে বিষাদে মন উদাসী
পুষ্পবিকাশের সুরে দেহ মন উঠে পূরে।’ কিংবা যুগল কণ্ঠে করেন ‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশকুসুমচয়নে/ সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে।’
শেষাংশে অর্জুন চিত্রাঙ্গদার এই আত্মবিশ্বাস, সততা ও ব্যক্তিত্বের প্রতি মুগ্ধ হন এবং তাকে পূর্ণ মর্যাদায় গ্রহণ করেন। চিত্রাঙ্গদা আত্মবিশ্বাসে গেয়ে ওঠেন, ‘আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী। নহি দেবী, নহি সামান্যা নারী ।‘
নাটকের 'কুরূপা' ও 'সুরূপা' বাহ্যিক সৌন্দর্যের দু'টি অবস্থা নয়, এগুলো নারীর দু'টি সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক। একদিকে শক্তিশালী, স্বাধীন, যুদ্ধপ্রবণ কুরূপা চিত্রাঙ্গদা; অন্যদিকে পুরুষের কামনা ও সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণায় নির্মিত সুরূপা চিত্রাঙ্গদা।
রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত এই দুই রূপকে চূড়ান্তভাবে এক পথে চালিত করেন।
সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন আদৃতা রুদ্র, প্রাচী সেন, উর্বশী, এলড্রিন ক্রাউলী, যীশু, শর্মিলা, ডালিয়া, পান্না, মুন্নী, বনি, প্রিয়ন্তী, ঐশী ও অমিতা। নৃত্য পরিবেশন করেন সুচনা বসাক, প্রিয়াংকা বড়ুয়া, অন্তর দে, অত্রি ভট্টাচার্য্য, ঐশী, জয়া, পুনম, সেঁজুতি, প্রাপ্তি, শান্তশ্রী, আরশি, শ্রীতমা, কথা, পূর্বা, তুশি, পুনম, পূর্ণতা, তারা, অত্রি, সম্প্রীতি ও সুপর্ণা।
পাঠ করেন অণির্বাণ ভট্টাচার্য ও অমিতা। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন রিপন শীল, শ্যামল দাশ, রিকি বসাক, নন্দন নন্দী, ফারুক. সানি দে ও ক্যউপ মারমা। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন অভ্যুদয়ের সাধারণ সম্পাদক শৈবাল বড়ুয়া।
নিপ্পন পেইন্টের সৌজন্যে অভ্যুদয়ের দুদিনের অনুষ্ঠানে আগামীকাল শনিবার রয়েছে ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে’ শীর্ষক সংগীতানুষ্ঠান।







