চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজের গল্প
এপারে ঐতিহ্যের অহংকার ওপারে প্রকৃতির সৌন্দর্য

সংগৃহীত ছবি
গণি বেকারি থেকে চকবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটি চট্টগ্রামের মানুষজনের কাছে পরিচিত কলেজ রোড নামে। এই সড়কের মাঝামাঝি এক অনন্য দৃশ্য একই স্থানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এক পাশে চট্টগ্রাম কলেজ, অন্য পাশে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ। এ যেন একই মুদ্রার দুই পিঠ। একটি ঐতিহ্যের অহংকার, অন্যটি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের প্রতীক।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত, তেমনি শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বহন করে দীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ। প্রতিষ্ঠান দুটি যুগের পর যুগ শুধু শিক্ষা নয়, জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
প্রায় ১৯০ বছরের গৌরবময় ইতিহাস নিয়ে চট্টগ্রাম কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৮৩৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৮৬৯ সালে কলেজে রূপান্তরিত হয়। ঢাকা কলেজের পর এটি দেশের দ্বিতীয় প্রাচীন কলেজ হিসেবে স্বীকৃত।
চট্টগ্রাম কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি ‘ব্র্যান্ড’। এখানকার শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে নিজেদের কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রদূত প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কবি নবীনচন্দ্র সেন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, রাজনীতিবিদ এম মোর্শেদ খান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, অভিনেতা আবুল হায়াতসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তিত্ব এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই কলেজের ক্যাম্পাস বিস্তৃত, সবুজে ঘেরা ও প্রাণবন্ত। প্রায় ৬ একর জায়গাজুড়ে ১৬টি ভবন নিয়ে গড়ে উঠেছে এর অবকাঠামো। ক্যাম্পাসের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ড। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম, ক্রীড়া সুবিধা, এমনকি একটি ব্যাংক শাখাও।
চট্টগ্রাম কলেজের ঠিক বিপরীতেই অবস্থিত হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ। যেখানে প্রকৃতি ও প্রাচীনতা একসঙ্গে মিশে গেছে। পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা এই কলেজের ক্যাম্পাস সবুজে ঘেরা, শান্ত ও মনোমুগ্ধকর।
১৮৭৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে চট্টগ্রাম মাদ্রাসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এটি ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং অবশেষে একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ কলেজে রূপান্তরিত হয়। মহসিন ফান্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ চট্টগ্রামের শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
এই কলেজে পড়েছেন চবির সাবেক ভিসি ও সাহিত্যিক আবুল ফজল, আবদুল করিম, ড. হাছান মাহমুদ, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। ফলাফলের দিক থেকেও এটি কোনো অংশে পিছিয়ে নয়, বরং অনেক সময় চট্টগ্রাম কলেজের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হয়।
মহসিন কলেজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ঐতিহাসিক স্থাপনা। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ‘পর্তুগিজ ভবন’ প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি স্থাপত্য। এটি নিয়ে রয়েছে নানা লোককাহিনী। এছাড়া ‘দারুল আদালত’ নামের প্রাচীন আদালত ভবনটিও এই ক্যাম্পাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজ—এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায়ই তুলনা করা হয়। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে চট্টগ্রাম কলেজ প্রথম পছন্দ, আর মহসিন কলেজ থাকে দ্বিতীয় তালিকায়। তবে বাস্তবে শিক্ষা, ফলাফল ও সাফল্যের দিক থেকে একটিও অন্যটির চেয়ে কম নয়।
বরং বলা যায়, এই দুটি কলেজ একে অপরের পরিপূরক। একটি ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও একাডেমিক গৌরবের প্রতীক, অন্যটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও নান্দনিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
কলেজ রোডের এই দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠান দুটি শুধু কলেজ নয়, চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিক্ষার জীবন্ত প্রতীক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা গড়ে তুলছে জ্ঞানী, সচেতন ও দক্ষ নাগরিক।



