এক কাজ বাস্তবায়নে চলছে দুই প্রকল্প

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কাজ একটি, কিন্তু সরকারের দুই ভিন্ন সংস্থা আলাদা বাজেট নিয়ে করে যাচ্ছে সমান্তরালভাবে। চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন কৌশল বা ‘ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন মাস্টারপ্ল্যান’ প্রণয়নে দেখা গেছে এমন নজিরবিহীন ঘটনা।
২০২০ সাল থেকে এ কাজটির পেছনে সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ খরচ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। অথচ একই কাজ নতুন করে করতে ২০২২ সালে আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সিডিএর পুরো মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের ব্যয় ৩৬ কোটি টাকা, আর ডিটিসিএর এই পরিবহন প্রকল্পের ব্যয় ৭০ কোটি টাকা।
সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র সমন্বয়হীনতার কারণে জনগণের করের টাকার এমন অপচয়কে ‘অর্থের শ্রাদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন, একদিকে যখন সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো হচ্ছে, তখন অন্যদিকে
সরকারি সংস্থাগুলো একই কাজের পেছনে দ্বিগুণ অর্থ ঢেলে অপচয় করছে মেধা, শ্রম ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের। সিডিএর নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে ‘প্রিপারেশন অব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান’ এই নামে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। প্রকল্পের আওতায় ২০৪১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কৌশলগত দিকনির্দেশনাসহ মোট সাতটি বড় খসড়া তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে স্ট্রাকচারপ্ল্যান, অ্যাকশন এরিয়াপ্ল্যান, ড্রেনেজ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মাস্টারপ্ল্যান এবং জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো ‘ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন মাস্টারপ্ল্যান’। ৩৬ কোটি টাকার এ প্রকল্পের একটি বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে নগরের দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন কৌশল প্রণয়নে।
সিডিএর এ কাজ চলমান থাকার মধ্যেই ২০২২ সালের অক্টোবরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান ডিটিসিএ ‘ট্রান্সপোর্ট মাস্টারপ্ল্যান অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ফিজিবিলিটি স্টাডি ফর আরবান মেট্রোরেল ট্রানজিট কনস্ট্রাকশন ফর চিটাগাং মেট্রোপলিটন এরিয়া’ নামে আরেকটি পৃথক প্রকল্প নেয়। ৭০ কোটি টাকার এই প্রকল্পেরও মূল লক্ষ্য চট্টগ্রাম নগরীর ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি। অর্থাৎ একই শহরের যাতায়াত ব্যবস্থার নকশা তৈরিতে দুটি সংস্থা পৃথকভাবে খরচ করছে মোট ১০৬ কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কীভাবে এক কাজ দুবারের জন্য বিপুল বরাদ্দ দিল? এর পেছনে কাজ করেছে কোন পদ্ধতি?
জানতে চাইলে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বিষয়টি একরকম অস্বীকার করে বলেছেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে আলাদা করে ট্রাফিক মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে না। ট্রাফিক মাস্টারপ্ল্যানের জন্য ডিটিসিএর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।’
তবে সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী বিষয়টি এড়াতে চাইলেও সংস্থাটির নিজস্ব নথিতেই মিলেছে ভিন্ন তথ্য। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে সিডিএর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ডেটা এক্সপার্ট-টিলার-ইজিএস’ যৌথভাবে যে ইনসেপশন প্রতিবেদন জমা দেয়, তার ‘কম্পোনেন্ট ৪’-এর অধীনে ২০৪১ সাল পর্যন্ত একটি নতুন ‘ট্রাফিক ও ট্রান্সপোর্টেশন মাস্টারপ্ল্যান’ তৈরির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত সিডিএর ‘প্রিলিমিনারি সার্ভে রিপোর্টে’ দেখা যায়, এই পরিকল্পনার জন্য ১২ ধরনের পরিবহন সমীক্ষাও এরই মধ্যে শেষ করেছে সিডিএ। যেখানে ১০ হাজার ৮২৪টি পরিবারের যাতায়াত তথ্য এবং ৬ হাজার ৮৬৪ জন যাত্রীর সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া আছে। নথিতে স্পষ্ট বলা আছে, এই ডেটা ২০৪১ সালের পরিবহন কৌশল ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরির জন্যই সংগ্রহ করা হয়েছিল।
একই কাজে ডিটিসিএর নতুন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার ও প্রকল্প পরিচালক মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেছেন, ‘সিডিএর সঙ্গে আমরা সমন্বয় করছি। তবে তারা মাত্র ৫ হাজার তথ্য নিয়ে এটি প্রণয়ন করেছে। আমরা ১৭ হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত পরিবহন মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করছি।’ ডিটিসিএ কর্মকর্তার এমন দাবিও নাকচ করে দিচ্ছে সিডিএর নথিপত্র। কারণ, সিডিএ এরই মধ্যে পরিবার ও যাত্রী মিলিয়ে প্রায় ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার শেষ করেছে।
সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠানের এমন কাজ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান। তিনি বলেছেন, ‘এগুলো জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। একটি কাজ কেন একই সরকারের দুটি সংস্থা আলাদাভাবে করবে? এদের মধ্যে যে কোনো সমন্বয় নেই, তা এই ঘটনাতেই স্পষ্ট। রাষ্ট্রের এসব অপেশাদার সংস্থার ভেতরে বড় ধরনের সংস্কার খুব জরুরি।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বললেন, ‘একটি শহরের জন্য যখন রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে এবং সেই প্ল্যানেই পরিবহন পরিকল্পনাটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তখন হঠাৎ অন্য একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের একই শহরের জন্য নতুন করে পরিবহনবিষয়ক সমীক্ষা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় মেধা, শ্রম ও অর্থের অপচয়।’




