জন্মাষ্টমীতে খালেদা জিয়া, দুর্গাপূজায় তারেক রহমান— সাক্ষী শতবর্ষী জেএম সেন হল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শতবর্ষ আগের ঐতিহাসিক ‘জেএম সেন হল’। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জে। অবিভক্ত ভারতবর্ষের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা যাত্রামোহন (জেএম) সেনের নামে তার সন্তান দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেন টাউন হলটি নির্মাণ করেছিলেন ১৯১৯ সালে। ক্রমে এটি হয়ে উঠেছিল অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের মিলনকেন্দ্র থেকে ঐতিহাসিক বিভিন্ন সংগ্রামের সূতিকাগার।
১৯৯১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালে জেএম সেন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী উৎসবে প্রধান অতিথি হয়ে এলেন তিনি। ২০২৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলেন খালেদাপুত্র তারেক রহমান। সেই জেএম সেন হলে তিনি আসছেন শারদীয় দুর্গোৎসবে।
মায়ের পথ ধরে ৩৫ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জেএম সেন হলে আসা নিয়ে আপ্লুত সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। প্রতি বছরের মতো এ হল প্রাঙ্গণে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ। এটি বন্দরনগরীর প্রধান পূজামণ্ডপ হিসেবে স্বীকৃত।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল চন্দ্র নাথ আগামীর সময়কে বললেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসবে কোনো সরকারপ্রধান চট্টগ্রামে আসেননি। বেগম জিয়া এসেছিলেন জন্মাষ্টমীর উৎসবে। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দুর্গাপূজায় পেয়ে আমরা সনাতনী সমাজ অত্যন্ত আনন্দিত, উচ্ছ্বসিত। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের বিশেষ চাওয়া বলতে এটুকুই, আমরা সনাতনীরা গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে আপনাকে ভোট দিয়েছি। আমাদের সুখে-দুঃখে সবসময় আমরা যেন আপনাকে পাশে পাই।’
প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে আজ সোমবার চট্টগ্রাম নগরীতে সনাতনীদের নিয়ে ‘সম্প্রীতির র্যালি’ বের করেছিলেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি বললেন, ‘১৯৯১ সালের ক্যাবিনেটে আমার আব্বা প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমান মন্ত্রী ছিলেন। তিনি তখনকার প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জেএম সেন হলে জন্মাষ্টমীর উৎসবে নিয়ে এসেছিলেন। এবার তার সন্তান তারেক রহমান আসছেন। বলতে গেলে একটি ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। গেল ১২ ফেব্রুয়ারি দ্বিধাহীন চিত্তে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনেরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পূজামণ্ডপে আগমন সনাতনীদের আস্থা আরও বাড়াবে।’
সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকালে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে রংপুর যাবেন। রাজশাহীতে আরেকটি মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে বিকাল সাড়ে ৫টায় সরাসরি আসবেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সড়কপথে সন্ধ্যায় জেএম সেন হলে পৌঁছাবেন।
পূজা পরিষদের নেতা নিখিল চন্দ্র নাথ জানালেন, প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ ৪০ মিনিটের মতো জেএম সেন হলে থাকবেন। প্রবেশের পরই পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে তিনি মঞ্চের সামনে বসবেন। মঞ্চে দুটি নৃত্য পরিবেশন ও গীতাপাঠ হবে। এরপর প্রধানমন্ত্রীকে মঞ্চে তোলা হবে। উত্তরীয় ও স্মারক শুভেচ্ছা গ্রহণ করে তিনি বক্তব্য রাখবেন। পরিষদের সভাপতি অর্পণ ব্যানার্জির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত সভা শেষ হবে।
নিখিল আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের সংখ্যালঘু অনেক ভাই-বোন নানা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছেন। চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভু আজ দুই বছর ধরে কারাবন্দি হয়ে আছেন। আমরা তার মুক্তি এবং সনাতনীদের হয়রানি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেব।’
জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে আগামীর সময়কে বললেন, ‘সমঅধিকার, সমান নাগরিক মর্যাদা, সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়, চাকরিতে নিয়োগে বৈষম্য দূর করাসহ বেশ কিছু দাবি আমাদের আছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছি।’
অভয়মিত্র মহাশ্মশান পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সৌরভপ্রিয় পাল বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে সনাতনীদের প্রধান প্রত্যাশা হল নিরাপত্তা। বাংলাদেশ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পিতৃভূমি। তারা যেন এদেশে নিরাপদে বসবাস করতে পারে।’
জেএম সেন হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনসহ নেতারা থাকবেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আগামীর সময়কে জানালেন, প্রধানমন্ত্রী জেএম সেন হল থেকে বেরিয়ে রেডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলে যাবেন। সন্ধ্যা ৭টায় সেখানে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির এক সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমরা চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সভাপতি-সেক্রেটারিরা মিলে সাংগঠনিক সভা করার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন সভা যেহেতু করবেন বেশি করে যাতে লোকজনকে বলি। এখন উত্তর, দক্ষিণ, মহানগর বিএনপির পুরো সাংগঠনিক কমিটি, উপজেলা ও থানা কমিটির সভাপতি-সেক্রেটারি, সহযোগী সংগঠনের সিনিয়র নেতাদের থাকতে বলা হয়েছে।’
এক ঘণ্টার সভা শেষে রাত ৮টায় প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে বিমাবন্দরে গিয়ে ঢাকায় রওনা দেবেন বলে জানালেন নাজিমুর রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে এর মধ্যে নগরীতে সৌন্দর্যবর্ধন, সড়ক উন্নয়ন, ঐতিহাসিক স্থাপনার সংস্কার করেছে সিটি করপোরেশন। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বললেন, ‘জেএম সেন হল প্রাঙ্গণে যাত্রামোহন সেনগুপ্ত, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, মাস্টারদা সূর্য সেন ও মহিমচন্দ্র দাশের আবক্ষ মূর্তি সংস্কার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথের অবৈধ ব্যানার, ফেস্টুন অপসারণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর সড়কও সংস্কার করা হয়েছে। আমরা চাই চট্টগ্রামে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রী যেন একটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও সুন্দর নগরীর চিত্র দেখতে পান।’
সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমাদের চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা থাকবে।’



