সম্পদ ৬ হাজার কোটির, নথিপত্রে নেই অস্তিত্ব
- চট্টগ্রাম ওয়াসা
- প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছরেও হয়নি সম্পদের বাস্তবতা যাচাই
- সম্পদ রেজিস্টার না থাকায় বারবার অডিট আপত্তি

সংগৃহীত ছবি
কাগজে-কলমে ৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ চট্টগ্রাম ওয়াসার। এর মধ্যে রয়েছে মূল্যবান জমি, প্ল্যান্ট ও সরঞ্জাম। বাস্তবে এসব সম্পদের বৈধ নথি ও মালিকানার অস্তিত্ব আছে কি না, তা জানা নেই সরকারি সংস্থাটির। কারণ, প্রতিষ্ঠার ৬৩ বছরেও যাচাই করেনি যে কী পরিমাণ সম্পদ আছে এবং এর অবস্থান কোথায়। স্থায়ী সম্পদের নেই কোনো রেজিস্টার। প্রতি বছর অডিটে নিরীক্ষকরা আপত্তি দিয়েই যাচ্ছেন আর বলছেন, ‘নথিপত্র না থাকায় ওয়াসার দাবি করা স্থায়ী সম্পদ মিলিয়ে দেখা যায়নি।’ এটি প্রচলিত আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক হিসাব মানেরও লঙ্ঘন।
হিসাব বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ‘স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার’ সংরক্ষণ না করার কারণে তৈরি হয়েছে আর্থিক জালিয়াতি ও সম্পদ আত্মসাতের ক্ষেত্র। কাগজে-কলমে অস্তিত্বহীন যন্ত্রপাতি, গাড়ি বা সরঞ্জাম দেখিয়ে সরকারি অর্থ তুলে নেওয়া কিংবা আগে কেনা সম্পদকেই নতুন দেখিয়ে দ্বৈত বিল পরিশোধের ঝুঁকি রয়েছে। প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দেখানো, মালপত্র গোপনে সরিয়ে ফেলা বা অনুমোদন ছাড়া পুরনো গাড়ি-যন্ত্রপাতি বিক্রি করে অর্থ লোপাট করা হলেও কোনো কর্মকর্তার ওপর দায় নির্ধারণের সুযোগ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি এড়াতে এবং বড় প্রকল্পের কেনাকাটায় অস্বচ্ছতা বজায় রাখতেই বছরের পর বছর কৌশলে চালু রাখা হয়েছে এই ব্যবস্থা।
‘স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার না থাকলে তৈরি হয় নানা আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্র। সংস্থাটির কোনো সম্পদ কেউ বিক্রি করে দিলে সেটি যাচাই করা সম্ভব হবে না। প্রতি বছর পুরো সম্পদের অবচয় দেখানো হচ্ছে। কোন সম্পদের অবচয় কতটুকু, তা দেখার সুযোগ নেই। সম্পদের প্রকৃত হিসাবেরও সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানের লঙ্ঘন। রেজিস্টার ও আলাদা ট্যাগিং না থাকায় কোন সম্পদ ব্যবহারের অনুপযোগী বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে, তা যাচাই করা অসম্ভব’— হিসাব রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি সাব্বীর আহমেদ।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বারবার আপত্তি: চট্টগ্রাম ওয়াসার সাত বছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের প্রতিবেদনে ২ হাজার ৯০১ কোটি টাকার বেশি স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নিরীক্ষা কার্যক্রম পরে শুরু হওয়ায় ২০২১ সালের ১১ মার্চ নমুনার ভিত্তিতে যাচাইয়ের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি পর্যাপ্ত নথিপত্র। এতে নিশ্চিত করা যায়নি ওই সম্পদের প্রকৃত অস্তিত্ব ও প্রদর্শিত মূল্যের সত্যতা। আন্তর্জাতিক হিসাব মান (আইএএস-৩৬) অনুযায়ী সম্পদ ব্যবহারযোগ্য আছে কি না, তা যাচাইয়ে বাধ্যতামূলক ‘ইম্পেয়ারমেন্ট টেস্ট’ করার নিয়ম থাকলেও তা পালন করেনি ওয়াসা।
এরপর সব অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসেছে একই আপত্তি। চলতি বছরের ৯ জুন জমা দেওয়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনেও নিরীক্ষকরা লিখেছেন, কোনো স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার সংরক্ষণ করে না সংস্থাটি। এ কারণে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যয় থেকে অবচয় বাদ দিয়ে থাকা ৬ হাজার ৭৯ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ বাস্তবে যাচাই করা যায়নি।
এ রকম অবাস্তব পরিস্থিতিতেও (২০২৩-২৪ অর্থবছরে) এক বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম ওয়াসার স্থায়ী সম্পদের হিসাব প্রায় দ্বিগুণ। বছরের শুরুতে স্থায়ী সম্পদ দেখানো হয়েছিল ৭ হাজার ২০৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে (২০২২-২৩) ছিল ৩ হাজার ৪৮৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
আইন, নির্দেশিকা ও বিধি কী বলে: ২০২৫ সালের জুনে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রণীত সরকারি সম্পদ ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও হিসাব বিভাগের অধীনে প্রতিটি স্থায়ী সম্পদের নাম, কিউআর আইডি কোড, কেনার তারিখ, প্রকৃত মূল্যের সঙ্গে অবস্থান উল্লেখ করে ‘পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী সম্পদ রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণ’ বাধ্যতামূলক। এই নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ করা হয়, স্থায়ী সম্পদের বাস্তবসম্মত গণনা বছরে একবার শেষ করতে হবে। প্রশাসন বিভাগ ও অর্থ-হিসাব বিভাগের প্রতিনিধিদের যৌথ উদ্যোগে প্রতি তিন বছরে অন্তত একবার সব সম্পদ গণনা ও যাচাই করা বাধ্যতামূলক। এরপর দিতে হবে প্রতিবেদন।
সরকারের জেনারেল ফাইন্যান্সিয়াল রুলসের বিধি ১৬০ ও ১৬১ অনুযায়ী, আসবাবপত্র, প্ল্যান্ট, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের হিসাব সাধারণ মালপত্র থেকে পৃথকভাবে রাখতে হবে। এ ছাড়া ওয়াসা আইনেও ৪০ ধারা অনুযায়ী বার্ষিক হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
আর্থিক বিশৃঙ্খলার বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বলেছিলেন, ‘যেদিকে হাত দিই, সেদিকে নানা জঞ্জাল। চেষ্টা করছি, সব জঞ্জাল পরিষ্কার করে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নতুন করে ঢেলে সাজাতে। এতদিন স্থায়ী সম্পদের রেজিস্টার ছিল না। চট্টগ্রাম ওয়াসার কোথায় কী সম্পদ আছে, তা যাচাই করা হচ্ছে।’



