আগামীর সময়

জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিচ্ছে ‘ই-বাইক’

  • ১০ টাকায় চলবে ৮০ কিলোমিটার
জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিচ্ছে ‘ই-বাইক’

ই-বাইক

দেশে-বিদেশে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান সংকটে ব্যক্তিগত ব্যবহারের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন মোটরসাইকেলের বিক্রিতে বড় ধ্বস নেমেছে। এতে মোটর সাইকেল শোরুমে ক্রেতার হাহাকার চললেও বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইলেকট্রিক চালিত ‘ই-বাইক’। মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত অকটেনের বিপরীতে বিদ্যুতপ্রাপ্তি তুলনামূলক সহজলভ্য এবং খরচ সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে ইলেকট্রিক বাইকের দিকেই ঝুঁকছেন কম আয়ের লোকজন।

চীন থেকে পড়ালেখা শেষ করে আসা আনাস হিসাব কষে বলছেন, আমাদের বাইকগুলো আড়াই ঘণ্টা রিচার্জে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে। সেখানে বিদ্যুৎ খরচ হয় মাত্র এক ওয়াটের অর্থাৎ এক ইউনিটের কম। এক ওয়াট বিদ্যুতের সরকারি দাম ১৪ টাকা। সে হিসেবে আমাদের খরচ হয় ১০ টাকা।

আনাস প্রচলিত মোটর বাইকের সঙ্গে ই-বাইকের তুলনা করেন এভাবে, ‘প্রচলিত বাইক এক লিটার চলে ৩০-৩৫ কিলোমিটার। দুই লিটারে চলে ৭০ কিলোমিটার। দুই লিটার অকটেনের দাম ২৫০ টাকা। মোটরবাইক ২৫০ টাকায় চলে ৭০ কিলোমিটার আর ই-বাইক ১০ টাকায় চলে ৮০ কিলোমিটার।’

বর্তমানে চট্টগ্রামে দুই থেকে তিনটি কোম্পানি এই ই-বাইক আমদানি করে বাজারে সরবরাহ করছেন। এরমধ্যে রিভো ব্রান্ড বেশ কটি মডেল বাজারে এনেছে। তাদের ই-বাইক ৯০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে একেবারে ভালো মানের আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আছে। এসব বাইক যত বেশি দামে কিনবেন তত বেশি ব্যাটারি ক্যাপাসিটি। আর স্পিড হবে তত বেশি। ব্যাটারি সক্ষমতা বেশি মানে বেশি পথ চলবে। আরামের দিক থেকে বেশি দামি বাইক আরাম বেশি। যেমন আড়াই লাখ টাকা দামেরই-বাইকের মাইলেজ ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত।

এখন পর্যন্ত ই-বাইক পরিচালনাকারীরা সরকারের বিআরটিএ থেকে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই যারা দুই আড়াই লাখ টাকা দামের ই-বাইক কিনতে চাইছেন, তারা কিছুটা দ্বিধার মধ্যে আছেন। ই-বাইক প্রথম পরিবেশবান্ধব। জ্বালানি সাশ্রয়ী এবং পরিবহন খরচ অনেক কম। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে সরকার যখন সাশ্রয়ের জন্য স্কুল কলেজ পর্যন্ত তিনদিন অফলাইন, তিনদিন অনলাইনে চালুর সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে। এমন সময় জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে ই-বাইকের ব্যবহার।

ইলেকট্রিক বাইক বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে ই-বাইকের দিকে ক্রেতাদের ঝোঁক বাড়বেই তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য এই বাইক পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন দরকার।

চট্টগ্রামে রিভো ব্রান্ডের ই-বাইকের আমদানিকারক জারিফ মোটরসের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ হাসিব শেখ আগামীর সময়কে বিস্তারিত তথ্য দেন, ‘মোটরসাইকেলের তুলনায় ইজিবাইক চালানো অনেক বেশি সাশ্রয়ী। একবার চার্জ দিয়ে ৮০ কিলোমিটার চলতে পারবে। একবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খরচ পড়বে মাত্র ১০ টাকার মতো! চট্টগ্রাম নগরীতে সারা দিনে ১০ টাকা খরচ করলেই অফিস আসা-যাওয়া থেকে শুরু করে বাজার সদাই সবই করা যাবে।’

তার মতে, ই-বাইকের একটি ভাইবস চট্টগ্রাম শহরে এসেছে অন্তত এক বছর আগে। কিন্তু একমাস ধরে এর বিক্রি বেড়েছে বেশি। ঈদের আগে আমরা ৬০টি ই-বাইক বিক্রি করেছি। এর মূল কারণ জ্বালানি সংকট। হাসিব শেখের ধারণা, ই-বাইকের ক্রেতা প্রধানত নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এখানে ব্যাংকার যেমন আছেন, তেমনি আছেন বিভিন্ন বেসরকারি অফিসের ছোট কর্মকর্তা। আছেন ফুড সরবরাহকারী। এখন থেকেই যদি ভালো মানের গাড়ি আমদানির নিশ্চয়তা ও দেশীয় উদ্যোক্তারা তৈরি করে বাজারজাত করার সুযোগ করা গেলে দারুণ সাড়া ফেলবে।

রিভো মোটরস থেকে ৮০ হাজার টাকায় ই-বাইক কিনে ফুড পান্ডাতে খাবার সরবরাহ করছেন রহিম উল্লাহ। হালিশহর মিলানো এক্সপ্রেস থেকে বার্গার নিয়ে পানির কল এলাকায় যাচ্ছিলেন তিনি। তার মতে— এখনকার সময়ে ই-বাইক না থাকলে আমাদের মতো ফুড সাপ্লাইয়ারদের ইনকাম বন্ধ হয়ে যেতো। কারণ একবার অকটেন নিতে গিয়ে দিনের অর্ধেক সময় চলে যাচ্ছে। আমরা যত বেশি ফুড পরিবহন করবো ততবেশি ইনকাম।

এনআরবি ব্যাংকের কর্মী সোহেল আরেফিনের ভাষ্য, এখনই এসব ইজি বাইক মান সম্পন্ন আমদানির দিকে নজর দিয়ে নিশ্চিত করা উচিত। আর দ্রুত একটি নীতিমালা করা উচিত আমদানি সরবরাহ নিবন্ধন নিয়ে। সিদ্ধান্ত নিতে যত দেরি হবে, ততই অন্যথায় জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি সম্ভাবনায় উদ্যোগ আঁতুড় ঘরেই মৃত্যু হবে।

চট্টগ্রামে ই-বাইকের যন্ত্রাংশ আমদানি করে সংযোজনের পর বিক্রি করছে রিডেভো বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সাতটি ব্রাঞ্চ খুলে ই-বাইক বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানটি বাজারের অন্য প্রতিযোগিতার তুলনায় কমদামে সবচেয়ে ভালো মানের বাইক বিক্রি করছে। তাদের বাইক ৯০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। দিনে তাদের বিক্রি হচ্ছে সাত থেকে আটটি বাইক।

আগামীর বাংলাদেশ হবে ই-বাইকের-এ তথ্য জানান রিডেভো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনাস উল হক ‘চীনা গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি যেভাবে ট্রাডিসনাল গাড়ির বাজার দখল করছে, তেমনিভাবে ই-বাইক দখল করে নেবে মোটর বাইকের বাজার। দেশের চলমান জ্বালানি সংকটে বাজার দ্রুতই দখল করতে যাচ্ছে ই-বাইক।’

    শেয়ার করুন: