চট্টগ্রামে ধকল সামলে কতদূর এগোল পুলিশ
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম পুলিশ
- ২০২৬ সালে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ১২%
- ঢাকা-চট্টগ্রামের পরিস্থিতি বেশি নাজুক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম নগরের একটি রেস্তোরাঁয় নিয়মিত যাতায়াত খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্যের এক পাইকারি বিক্রেতার। সেখানে বসেই কফি পানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে চলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। সম্প্রতি একটি ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন বাহিনীর তাণ্ডবের পর এক বিকালে তার চেহারায় দেখা গেল দুশ্চিন্তার ছাপ। সিনিয়র এক সাংবাদিককে দেখে ওই ব্যবসায়ী বললেন, ‘৫ আগস্টের পর পুলিশ কেমন জানি হয়ে গেছে। সন্ত্রাসীরা এত বেপরোয়া হয়ে গেল, পুলিশ কিছু করতে পারছে না কেন?’
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের পাঁচ শতাধিক থানা-ফাঁড়িসহ পুলিশের স্থাপনায় আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে প্রাণ যায় ৪৪ পুলিশ ও র্যাবে কর্মরত দুই বিজিবি সদস্যের।
অভ্যুত্থানের দুই বছর পর এসে ওই ব্যবসায়ীর প্রশ্নটিই এখন সবার কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ধকল কাটিয়ে পুলিশ কি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে? তারা কি মনোবল ফিরে পেয়েছে? মাঠের বাস্তবচিত্র বলছে, পুলিশে এখনো গতি ফেরেনি।
বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে পুলিশ বাহিনী। যার রেশ ধরে তৈরি হয়েছে জনরোষ। সেই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থান- পরবর্তী সময়ের হামলা-হত্যা, মব সন্ত্রাসের ভীতি এখনো তাড়া করে ফিরছে বাহিনীর সদস্যদের। অনেকে এখনো পালিয়ে আছেন। অনেকে কারাগারে। চাকরিচ্যুত হয়েছেন অনেকে। পেশাদার দক্ষ সদস্যদেরও ‘স্বৈরাচারের দোসর’ তকমার গ্লানি সইতে হচ্ছে। বিপরীতে ফায়দা লুটছেন অদক্ষ, অযোগ্যদের কেউ কেউ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘২০২৪ সালের ৫ থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে পুলিশ কোথাও ছিল না বললেই চলে। মনোবল ভেঙে পুরো বাহিনীই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এরপর পুলিশকে যখন ধীরে ধীরে সক্রিয় করা হচ্ছিল, তখন শুরুতেই আমাদের পুলিশ বিদ্রোহ, আনসার বিদ্রোহ, পল্লী বিদ্যুতের কর্মচারীদের আন্দোলনসহ অনেক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। দেশকে মোটামুটি একটা স্বাভাবিক ধারায় নিতে সময় লেগেছে।’
পুলিশের সাবেক এক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় শতভাগ বিধিবিধান, আইনের ধারা-উপধারা মেনে পুলিশের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সেই পরিবেশ বাংলাদেশে নেই। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভুটানের মতো কম উন্নত দেশেও পুলিশের কাজ করার একটা সহনশীল পরিবেশ আছে। সেটি আমাদের দেশে নিশ্চিত করা গেলে পুলিশও পারবে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের এক জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) মতে, পুলিশের মধ্যে ৫ আগস্টের আগের সক্ষমতার অর্ধেকও এখনো ফেরানো যায়নি। তার ভাষ্য, ‘৫ আগস্টের পর থানায় আলো জ্বলেনি। জিডি নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। বাহিনীর কম-বেশি সব সদস্য ট্রমায় আক্রান্ত ছিলেন। তাদের মনে অনেক প্রশ্ন। অভ্যুত্থানের সময় কি পুলিশই শুধু ফায়ার করেছে? পুলিশকে কেন প্রাণ দিতে হলো?’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সদস্যদের টার্গেট করে নেতিবাচক প্রচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। গত ৩ আগস্ট এক বিবৃতিতে সংগঠনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হক ডাবলু বলেছেন, ‘কোনো পুলিশ সদস্য অতীতে গুম-খুনে জড়িত থাকলে প্রচলিত আইনে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। শুধু বিগত সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনের কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য হলো পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবল দুর্বল করা।’
আগামীর সময়ের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বললেন, ‘জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ পুলিশ বাহিনীর জন্য নিঃসন্দেহে একটি কঠিন সময় ছিল। দুই বছরে সেই পরিস্থিতি অতিক্রম করতে বাহিনী সক্ষম হয়েছে। ধাপে ধাপে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এসেছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক: পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান প্রতিবেদন বলছে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে সারা দেশে ৬২৬ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে ২০০ করে মানুষ খুন হয়েছে।
২০২৫ সালে সারা দেশে খুনের শিকার হন ৩ হাজার ৭৮৫ জন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। চলতি বছরে এসে হত্যার ঘটনা বেড়েছে ১২ শতাংশ। মোট হত্যাকাণ্ডের ৪৪ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত গত ২৪ মাসে সারা দেশে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮টি। খুনের মামলা ৭১৩৬টি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ২৪ মাসে সারা দেশে মামলার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩২টি। হত্যা মামলা হয়েছিল ৬ হাজার ১৭১টি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘পুলিশের রি-অর্গানাইজেশনে সময় লাগবে। ভেতরে অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। কমান্ড, র্যাংকিংয়ে চেঞ্জ হচ্ছে। এ পরিবর্তনগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত রি-অর্গানাইজেশনটা হবে না। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, পুলিশের দুর্বল অবস্থার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে মারামারি হচ্ছে। এতে অন্যরা সুযোগ নিচ্ছে। পলিটিক্যাল ইস্যু সেটেলড না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ কাজ করতে পারবে না।’
পুলিশের সাবেক একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক বলছিলেন, ‘পুলিশের হারানো মনোবল এখনো পুরোপুরি ফেরানো যায়নি। কাজ করার পরিবেশও সংকুচিত হয়ে গেছে। কীভাবে কাজ করলে আবারও চব্বিশের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না, সেটি এখনো পুলিশ বুঝতে পারছে না। এটি থেকে কখন পুলিশ পরিত্রাণ পাবে— এমন কোনো টাইমফ্রেম দেওয়া সম্ভব নয়।
’মাঠের চিত্র বলছে অপরাধীদের ‘পুলিশভীতি’ কমেছে: ‘বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা থানাগুলোয় আগুন দিয়েছে। যে পুলিশ জনগণের টাকায় পরিচালিত হয়, সেই পুলিশকেই আমরা পিটিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছি এ দৃশ্য কি আপনারা দেখেননি?’ গত ৫ আগস্ট চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির এক সমাবেশে প্রকাশ্যে কথাগুলো বলছিলেন এনসিপির এক নেতা। তার এ বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নেটিজেনরা বলতে শুরু করেন, একজন রাজনৈতিক নেতার এমন বক্তব্য প্রমাণ করে পুলিশের অবস্থান কতটা দুর্বল পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত বছরের মার্চে গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ পুলিশের একজন ওসিকে ফোন করে ‘উলঙ্গ’ করে পেটানোর হুমকিও দিয়েছিলেন। এ ছাড়া হরহামেশা পুলিশের ওপর দলবদ্ধ হামলার ঘটনা তো আছেই। গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের আমবাগান এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যাওয়া পুলিশের দুই উপপরিদর্শক (এসআই) হামলায় গুরুতর আহত হন।




