ওড়িশায় জাহাজডুবি
পদোন্নতি পেয়ে জাহাজে গিয়েই নিখোঁজ বাংলাদেশি নাবিক মামুন

আবদুল্লাহ আল মামুন
তিনমাস আগে পদোন্নতি পেয়ে চতুর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বিদেশি ‘ওশান উইনার’ জাহাজে কাজ শুরু করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ছেলে বেসরকারি মেরিন একাডেমি থেকে ডিগ্রি নিয়ে নাবিক জীবন শুরু করেন ২০১৪ সালে। এটি ছিল তার পঞ্চম জাহাজ। পদোন্নতির খবর পেয়ে ওমরাহ পালন করেন। এরপরই যোগ দেন এই জাহাজে।
গত শনিবার ভারতের ওড়িশার প্যারাবন বন্দর থেকে ‘ওশান উইনার’ জাহাজ সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল। মাঝপথে সাগরেই ডুবে যায়। সেই জাহাজে ২৪ নাবিকের মধ্যে ২০ জন চীন, ২ জন মিয়ানমার ও আর একমাত্র বাংলাদেশি ছিলেন মামুন।
দুর্ঘটনাস্থলে থাকা নিকটবর্তী বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি আইসোপস লাইফ র্যাফটের সাহায্যে ২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করে। পরে ভারতীয় কোস্টগার্ড তাদরে নিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছে। বাকিদের খোঁজ মেলেনি।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ভারতীয় কোস্ট গার্ড ও ভারতীয় নৌবাহিনী যৌথভাবে নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে। অভিযানে নৌবাহিনীর নজরদারি বিমান এবং কোস্ট গার্ডের তিনটি জাহাজ (বরদ, অনমোল ও বিজিত) নিয়োজিত রয়েছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় তল্লাশি কার্যক্রমে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, মামুনের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের উত্তর কাটিয়ার আমতলা এলাকায়।
আবদুল্লাহ আল মামুনের খোঁজ না পেয়ে পরিবারে চলছে কান্নার রোল। দেশে তার স্ত্রী, আট বছর বয়সী এক কন্যা, চার বছর বয়সী এক পুত্র সন্তান আছে। তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাবা-মা দুজনই বেঁচে আছেন কিন্তু বেশ অসুস্থ।
‘ওশান উইনার’ জাহাজটি পানামার পতাকাবাহী। কিন্তু ভাড়ায় চালাচ্ছে চীনের ‘ওশান উইনার শিপিং কোম্পানি লিমিটেড’। জাহাজটি ২৮ বছরের পুরনো। মামুন এর আগেও একাধিকবার এই জাহাজে কর্মরত ছিলেন। সেই কোম্পানিতে নিয়োগে বাংলাদেশি নাবিক সরবরাহকারী এজেন্ট হচ্ছে ‘এনটিএন ওশানিক প্লেজ লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মামুন নিজে। আর প্রধান তার বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজু। তৃতীয় শ্রেণী থেকে মেরিন একাডেমি ডিগ্রি অর্জন সব একসঙ্গে করেছেন দুজন। ফলে তাদের ঘনিষ্ঠতা অনেক বেশি। তিনি জানিয়েছেন, ‘প্রতিদিন ম্যাসেজ-কলে কথা হতো। শুক্রবার মামুনের সাথে আমার শেষ কথা হয়। শনিবার মেসেজ না পেয়ে জাহাজ ট্রেক করে দেখি খোঁজ নেই। পরে জাহাজ পরিচালনকারীকে জানালাম এরইমধ্যে খবর এলো জাহাজডুবির।’
সাদাতের ভাষ্য, ‘ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার পদে পদোন্নতির আগে আমিই তাকে উৎসাহ দিয়েছিলাম এই জাহাজে যোগ দিতে। সেই কথার জন্য এখন বেশি আফসোস হচ্ছে।
‘জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময় একসাথে কাটিয়েছি, কাবাঘরের সামনে দুজন কেঁদেছি একসাথে। আল্লাহ তুমি মামুনকে ফিরিয়ে দাও’, বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।
মামুনের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল বাকি জানালেন, ‘আব্বু-আম্মু দুজনের বয়স হয়েছে। আম্মুর আগে থেকেই হার্টের সমস্যা আছে। এই খবর শুনে অঝোরে কাঁদছেন। তার স্ত্রী বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। ভারতীয় নৌ বাহিনী আর কোস্টগার্ডের পেজ ফলো করছি। মামুন বেঁচে আছে কিনা সর্বশেষ খবর তো পাচ্ছি না!’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ম্যারেন্ট অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘আব্দুল্লাহ আল মামুনের খোঁজ পেতে আমরা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও), ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং তার নিয়োগদাতা চীনা কম্পানির সাথেও আমরা যোগাযোগ রাখছি।’







