চট্টগ্রামে বৃক্ষমেলা
অন্দরমহলের সৌন্দর্য বাড়াতে ইনডোর প্ল্যান্টের কদর

চট্টগ্রাম লালদিঘী মাঠ থেকে বিকালে তোলা ছবি। রনি দে, চট্টগ্রাম
এক পাশে টমেটো, বেগুন, লাউ, করলা ও ঝিঙ্গার চারা। অন্যপাশে সবেদা, মিশরীয় মাল্টা, চেরি ও নিমের গাছ। একটু সামনে গেলেই মনস্টেরা, স্নেক প্ল্যান্ট, জেড প্ল্যান্ট, জিজি প্ল্যান্ট ও গোল্ডেন পটোস। দেশি বনজ, ফলদ ও ঔষধি গাছের সঙ্গে বিদেশি ইনডোর প্ল্যান্টের সমাহার।
এমন বৈচিত্র্য এখন দেখা যাচ্ছে নগরীর লালদীঘি পাড়ের বৃক্ষমেলায়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও উত্তর বন বিভাগের আয়োজনে ১১ আগস্ট এই বৃক্ষমেলা শুরু হয়। মেলায় ৫৮টি স্টল রয়েছে। দুই সপ্তাহের এই মেলায় ফুল, ফল, ইনডোর প্লান্টের পাশাপাশি রয়েছে সার, মাটি, ফুলের টবও।
শনিবার সন্ধ্যায় মেলা ঘুরে দেখায় যায়, প্রচুর বৃক্ষপ্রেমী দর্শনার্থী। কেউ দেখছেন কেউবা কিনছেন নানা প্রজাতির চারা। বর্তমানে ইনডোর প্ল্যান্টের চাহিদাই বেশি বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। শহরে বাসার বাইরে গাছ লাগানোর জায়গা না থাকায় ইনডোর প্লান্টের চাহিদা বাড়ছে বলে তারা মনে করছেন। মনস্টেরা, স্নেক প্ল্যান্ট, ফার্ন, মার্বেল, জেনাডু, অ্যালোকেশিয়া, এগলোনিমা, পার্লার পাম, লাকি ব্যাম্বু, স্পাইডার প্ল্যান্ট ও গোল্ডেন পটোসের মতো গাছ জায়গা করে নিচ্ছে নগরবাসীর ঘর, বারান্দা ও অফিসে।
সবুজ মেলা নার্সারির সত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ তৌহিদ বলেন, তাদের কাছে প্রায় ৪০০ ধরনের গাছ রয়েছে। ধরন ও আকার অনুযায়ী এসব গাছের দাম ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা বা তারও বেশি। মনস্টেরার একটি গাছের দাম প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২ হাজার।
সৌখিন বৃক্ষপ্রেমী থেকে নার্সারির মালিক হয়ে গেছেন কেউ কেউ। যেমন সিটিজি প্ল্যান্ট স্টলের সবুজ হোসেন। তিনি শখের বশে ছাদ বাগান এবং ইনডোর প্লান্ট শুরু করেছিলেন বাসায়। সজল ইসলাম জানান, ২০২১ সালে শখের বাগান দিয়ে তার এই কাজের শুরু। পরে ব্যক্তিগত সংগ্রহ বাড়তে বাড়তে সেটিই নার্সারিতে রূপ নেয়।
সজলের সংগ্রহের অন্যতম প্রিয় গাছ ‘ফিলো বিউটি’। এটা তিনি মেলায় এনেছেন প্রদর্শনীর জন্য। কোনোভাবেই ফিলো বিউটি বিক্রি করতে রাজি নন তিনি।
মেলায় বিদেশি গাছের পাশাপাশি ক্যাকটাসের নানা প্রজাতি দেখা গেছে। অনেক ইন্ডিয়ান ক্যাকটাস, অর্কিড, কাটা মুকুট, ফার্ন ও বনসাইও রয়েছে। ক্যাকটাসের দাম ২৫০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। শাপলার চারাও বিক্রি হচ্ছে, যার দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা।
দর্শনার্থী নাসরিন নিপা বলেন, 'আজ প্রায় ৩ হাজার টাকার ইনডোর প্ল্যান্ট কিনেছি। শহরে জায়গার বড় অভাব। কিন্তু এই ইনডোর প্ল্যান্টগুলো সহজেই ঘরের ভিতরে রাখা যায়। বাসার সৌন্দর্যও বাড়ায়।'
গাছ কেনার পাশাপাশি এর পরিচর্যা নিয়েও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। বিক্রেতারা জানান, ইনডোর গাছের জন্য সাধারণ মাটির বদলে মোটা বালি, ভার্মিকম্পোস্ট, কোকোপিট, পারলাইট, কয়লা ও ধানের চিটা মিশিয়ে বিশেষ মিডিয়া বা মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। এতে পানি জমে শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। জেড প্ল্যান্ট ও জিজি প্ল্যান্টে তুলনামূলক কম পানি দিতে হয়।
ঔষধি গাছের মধ্যে নিম, বয়রা, হরতকী, আমলকি ও অ্যালোভেরার চারাও রয়েছে। পাশাপাশি জবা, গোলাপ, বেলি, জুঁই, নাইট কুইন, নয়নতারা, টগর, অপরাজিতা, কামিনী ও দোলনচাঁপার মতো ফুলের চারাও কিনছেন বৃক্ষপ্রেমীরা।
মেলা ঘুরে দেখা যায়, শুধু ফুল কিংবা শোভাবর্ধনকারী গাছ নয়, সবজি, ফলদ ও ঔষধি গাছের প্রতিও ক্রেতাদের আগ্রহ রয়েছে। টমেটো, সিলেটি বেগুন, ঝিঙ্গা, করলা, সিম, লাউ, পটল ও ক্যাপসিকামের চারা বিক্রি হচ্ছে। ফলজ গাছের মধ্যে রয়েছে লম্বা ও গোল জাতের সবেদা, মিশরীয় মাল্টা, পেয়ারা, আমড়া, কামরাঙ্গা, লিচু ও জলপাই।
গাছ কিনতে এসে নুপুর চৌধুরী জানান, 'গ্রামের বাড়িতে মা বাড়ির পাশে বাগান করতেন। তা দেখেই গাছের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। এখানে এত বড় জায়গা কোথায়? তাই বাসার বারান্দায় বাগান করি।'
নার্সারি ব্যবসায়ীদের মতে, আগে বড় জায়গায় ফুল ও ফলজ গাছ লাগানোর প্রবণতা বেশি থাকলেও নগরজীবনে সেই চিত্র বদলেছে। জায়গার সংকটে এখন বারান্দা, ছাদ কিংবা ঘরের ছোট একটি কোণেই গাছ রাখছেন অনেকে। একারণে দেশি ফলজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি বিদেশি ইনডোর প্ল্যান্টের বাজারও বাড়ছে।
একসময় গাছ লাগানোর জন্য বাড়ির উঠান কিংবা বড় জায়গার প্রয়োজন হতো। এখন সেই ধারণা বদলেছে। বারান্দার এক কোণ, ছাদের সামান্য জায়গা কিংবা ঘরের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে ছোট ছোট সবুজের পরিসর। নগরজীবনের সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশি বিভিন্ন গাছের সাথে বৈচিত্রময় বিদেশি ইনডোর প্ল্যান্টের চাহিদা বাড়ছে।






