বিশ্ব বিড়াল দিবস
যেই বিড়ালের স্মৃতিতে তৈরি হয়েছে ভাস্কর্য

সংগৃহীত ছবি
ইস্তাম্বুলের একটি ফুটপাত। সেখানে নিশ্চিন্তে হেলান দিয়ে বসে আছে গোলগাল এক বিড়াল। আশপাশে মানুষ চলাফেরা করছে, কেউ হয়তো আদর করতে চাইছে। কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজের মতো করে বসে থাকা বিড়ালটির চোখেমুখে এমন এক নির্লিপ্ত ভাব, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুতেই তার কিছু যায় আসে না। সাধারণ একটি মুহূর্তে তোলা এই ছবিই একসময় ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তের মধ্যে পরিচিত হয়ে ওঠে বিড়ালটি। শুধু ইস্তাম্বুল নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ চিনতে শুরু করেন তাকে। নাম তার টম্বিলি। আর মৃত্যুর পর এই বিড়ালের স্মৃতিকে ধরে রাখতে তৈরি করা হয় ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য।
তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের কাদিকয় জেলার জিভেরবে পাড়ার বাসিন্দাদের কাছে টম্বিলি ছিল ভীষণ পরিচিত। তুর্কি ভাষায় ‘টম্বিলি’ শব্দটি সাধারণত গোলগাল বা মোটাসোটা পোষা প্রাণীকে আদর করে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। বিড়ালটির শরীরের গড়নের সঙ্গে নামটি বেশ মানানসই।
তবে শুধু গোলগাল চেহারার জন্য নয়, মানুষের প্রতি তার নির্লিপ্ত আচরণও তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। কেউ তার সঙ্গে খেলতে চাইলে সে খুব একটা আগ্রহ দেখাত না। নিজের পছন্দের জায়গায় বসে থাকতেই যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত।
টম্বিলির জনপ্রিয়তার শুরু অবশ্য তার জীবনের শেষদিকে। ফুটপাতের ওপর তার একটি বিশেষ ভঙ্গিতে বসে থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই তাকে নিয়ে শুরু হয় মাতামাতি। ছবিতে তাকে এমনভাবে হেলান দিয়ে থাকতে দেখা যায়, যেন চারপাশের ব্যস্ততা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। ছবিটি হাজার হাজারবার শেয়ার করা হয়। অনেকে ছবির সঙ্গে মজার মন্তব্য জুড়ে দেন। কেউ আবার সম্পাদনার মাধ্যমে তার সামনে মদের গ্লাস কিংবা নানা ধরনের বিলাসী জিনিস বসিয়ে দেন। এভাবেই একটি পাড়ার পরিচিত বিড়াল হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে আলোচিত ইন্টারনেট মিম।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তা বেশিদিন উপভোগ করতে পারেনি টম্বিলি। এক মাস ধরে অসুস্থতায় ভোগার পর ২০১৬ সালের আগস্টের ১ তারিখ মারা যায় সে। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম হুরিয়েত নিউজে তার মালিকদের বরাত দিয়ে এ খবর প্রকাশ করা হয়। প্রিয় বিড়ালটির মৃত্যুতে শোক নেমে আসে জিভেরবে পাড়ায়। পাড়ার পরিচিত মুখ, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ এবং অনেকের কাছে প্রিয় এক সঙ্গী ছিল সে।
তার মৃত্যুর পর আশপাশের এলাকায় শোকবার্তা লেখা পোস্টার দেখা যায়। সেখানে লেখা ছিল, ‘তুমি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, আমাদের রাস্তার প্রিয় প্রতীক।’ কিন্তু শুধু কয়েকটি পোস্টার দিয়ে টম্বিলির স্মৃতি ধরে রাখতে চাননি স্থানীয়রা। তাদের ইচ্ছা ছিল, বিড়ালটির স্মরণে এমন কিছু করা হোক, যা দীর্ঘদিন ধরে তার উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেবে।
সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন তৈরির উদ্যোগ। অনলাইন আবেদনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ ডট অর্গে একটি আবেদন করা হয়। এতে প্রায় ১৭ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেন। আবেদনে কাদিকয় পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে টম্বিলির স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। মানুষের এই ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে স্থানীয় ভাস্কর সেভাল শাহিন ব্রোঞ্জের একটি ভাস্কর্য তৈরিতে সম্মত হন। ভাস্কর্যটিতে টম্বিলির সেই বিখ্যাত বসার ভঙ্গিই ফুটিয়ে তোলা হয়, যে ভঙ্গির ছবি তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছিল।
সেই বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবসে ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়। সেখানে জড়ো হন শত শত মানুষ। কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা জানান, কেউ রেখে যান বিড়ালের খাবার, আবার কেউ নিয়ে আসেন ফুল। পুরো আয়োজনটি তুরস্কের টেলিভিশনেও প্রচারিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাদিকয় পৌরসভার উপমেয়র বাসার নেসিপোগলু স্মৃতিসৌধটি নির্মাণে ভূমিকা রাখার জন্য এলাকার প্রাণীপ্রেমীদের ধন্যবাদ জানান।
ইস্তাম্বুলের মানুষের সঙ্গে বিড়ালের এই ভালোবাসার সম্পর্ক খুব পুরোনো এবং ঐতিহ্যের অংশ। এই শহরটিতে হাজার হাজার পথবিড়াল রয়েছে, যাদের স্থানীয়রা পরম মমতায় দেখাশোনা করেন। তুরস্কের একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, “তুমি যদি একটি বিড়ালকে মেরে ফেল, তবে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার জন্য তোমাকে একটি মসজিদ তৈরি করতে হবে।” এই প্রবাদটির পেছনের লোককথাটি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় পোষা বিড়াল ‘মুয়েজ্জা’কে ঘিরে।
লোককথায় প্রচলিত আছে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন তার নামাজের পোশাকের হাতা বিছিয়ে ঘুমিয়ে থাকা মুয়েজ্জাকে বিরক্ত করতে চাননি, তখন তিনি পোশাকের ওই অংশটি কাঁচি দিয়ে কেটে নিয়েছিলেন যাতে বিড়ালটি আরামে ঘুমাতে পারে। অন্য একটি প্রচলিত লোককথায় বলা হয়েছে, মুয়েজ্জা তাকে একটি বিষধর সাপের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি যখন বিড়ালটির পিঠে হাত বুলিয়ে দেন, তখন থেকেই নাকি বিড়ালদের ওপর থেকে পড়ে গেলেও পায়ে ভর দিয়ে মাটিতে নামার অদ্ভুত ক্ষমতা তৈরি হয়।





