‘নরকের দরজা’র আগুন নেভে না কেন

সংগৃহীত ছবি
সাধারণত একটি আগুনের আয়ু হয় কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন কিংবা খুব বেশি হলে কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু পৃথিবীর বুকে এমন কিছু আগুন রয়েছে, যা মানুষের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কয়েক দশক, এমনকি হাজার বছর ধরে জ্বলছে। আর এমন উদাহরন দিতে গেলে প্রথমেই চলে আসে তুর্কমেনিস্তানের ‘গেটস অব হেল’ বা ‘নরকের দরজা’র নাম।
তুর্কমেনিস্তানের বিস্তীর্ণ কারাকুম মরুভূমির বুকে অবস্থিত দারভাজা গ্যাস গহ্বর পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়। প্রায় ৬০ মিটার (১৯৬ ফুট) প্রশস্ত এই বিশাল গহ্বর অন্তত চার দশক ধরে অবিরাম জ্বলছে। রাতের অন্ধকারে এর আগুনের লেলিহান শিখা ও উত্তপ্ত বাতাস এমন এক দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা অনেকের কাছেই নরকের প্রবেশদ্বারের মতো মনে হয়। সেখান থেকেই এসেছে এর জনপ্রিয় নাম ‘গেটস অব হেল’।
তবে এই রহস্যময় গহ্বরের জন্মকাহিনি নিয়ে এখনো রয়েছে মতভেদ। একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পের সময় দুর্ঘটনাবশত ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডারে আঘাত লাগে এবং মাটি ধসে তৈরি হয় এই গহ্বর। অন্য একটি মত বলছে, গহ্বরটি আরও আগে, সম্ভবত ১৯৬০-এর দশকেই প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।
যেভাবেই এর উৎপত্তি হয়ে থাকুক না কেন, পরে ভূতত্ত্ববিদেরা যখন গহ্বর থেকে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস বের হতে দেখেন, তখন পরিবেশগত বিপর্যয় এড়াতে গ্যাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের ধারণা ছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই গ্যাস ফুরিয়ে যাবে এবং আগুন নিভে যাবে। কিন্তু সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ নয়, কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও আগুন এখনো জ্বলছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই গহ্বরটি তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানজুড়ে বিস্তৃত একটি বিশাল তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে ভূগর্ভে থাকা বিপুল পরিমাণ মিথেনই সম্ভবত এই আগুনের জ্বালানির প্রধান উৎস, যা এটিকে কার্যত অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জ্বলতে সাহায্য করছে।
এই রহস্য উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা অবশ্য থেমে থাকেনি। ২০১৩ সালে কানাডীয় অভিযাত্রী জর্জ কুরুনিস একটি বিশেষ অভিযানে দারভাজা গহ্বরে অবতরণ করেন। তাপ-প্রতিরোধী বিশেষ পোশাক পরে তিনি গহ্বরের তলদেশে নেমে মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। গবেষণার সময় তিনি এমন কিছু সরল জীবের সন্ধান পান, যারা প্রচণ্ড তাপ ও প্রতিকূল পরিবেশেও বেঁচে থাকতে সক্ষম। এই আবিষ্কার পৃথিবীর চরম পরিবেশে প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
যদিও ‘গেটস অব হেল’ বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত অনির্বাণ আগুনগুলোর একটি, এটি কিন্তু সবচেয়ে প্রাচীন নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভস্থ কয়লার স্তরে আগুন লেগে শত শত, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকার ঘটনাও রয়েছে।
এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ অস্ট্রেলিয়ার মাউন্ট উইঙ্গেনের নিচে থাকা কয়লার স্তরের আগুন, যা বিজ্ঞানীদের মতে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যতদিন পর্যন্ত এসব ভূগর্ভস্থ জ্বালানির ভাণ্ডার শেষ না হবে, ততদিন পর্যন্ত এই আগুনগুলোও জ্বলতে থাকবে।
তুর্কমেনিস্তানের ‘নরকের দরজা’ তাই শুধু একটি পর্যটন আকর্ষণ নয়; এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক রহস্য, মানবিক ভুল হিসাব এবং প্রকৃতির অসীম শক্তির এক অনন্য প্রতীক।
সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস




