যে গ্রামে গাড়ির চেয়ে নৌকার কদর বেশি

এমন দৃশ্যের দেখা মিলবে নেদারল্যান্ডসের ছোট্ট গ্রাম গিথহর্নে
ধরুন, কোথাও বেড়াতে গিয়ে দেখলেন কেবল বাড়ি আছে কিন্তু রাস্তা নেই! একটি বাড়ি থেকে আরেকটি বাড়িতে যেতে হলে কখনো কাঠের সেতু পেরোতে হচ্ছে, কখনো নৌকায় উঠতে হচ্ছে। গাড়ির হর্ন নেই, যানজট নেই। আছে সরু খাল, সবুজ ঘাস আর পানির ওপর দিয়ে ধীরে এগিয়ে চলা নৌকা।
এমন দৃশ্যের দেখা মিলবে নেদারল্যান্ডসের ছোট্ট গ্রাম গিথহর্নে। দেশটির ওভারআইসেল প্রদেশে অবস্থিত এই জলগ্রামকে অনেকে বলেন ‘উত্তরের ভেনিস’। তবে ভেনিসের মতো জমজমাট নগর নয়, গিথহর্ন বরং শান্ত, সবুজ আর জলঘেরা এক জনপদ।
গ্রামের ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়বে খাল। খালের দুই পাশে সারি সারি সুন্দর বাড়ি। বাড়িগুলোর সামনে ছোট বাগান, ফুল আর সবুজ ঘাস। কোথাও কাঠের সেতু খালের ওপর দিয়ে এক বাড়িকে আরেকটির সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর খালের পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট নৌকা।
গিথহর্নে হাঁটা কিংবা সাইকেলে চলাচলের সুযোগ আছে। কিন্তু জলপথে চলাচলই এই গ্রামের সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘পুন্টার’ নৌকা এখানকার জীবনের সঙ্গে বহুদিন ধরে জড়িয়ে আছে। চ্যাপ্টা তলার এই নৌকাগুলো একসময় শুধু মানুষ বহনের কাজে নয়, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস পরিবহনেও ব্যবহৃত হতো।
আজ অবশ্য সেই নৌকাগুলোর বড় একটি অংশ পর্যটকদের জন্য। খালের পানিতে বৈদ্যুতিক নৌকা কিংবা ছোট নৌকায় চড়ে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ান। চারপাশের শান্ত পরিবেশে নৌকার শব্দও যেন আলাদা করে শোনা যায়।
গিথহর্নের এই জলপথ কিন্তু কেবল সৌন্দর্যের জন্য তৈরি হয়নি। গ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে মাটির নিচের পিট বা টার্ফ উত্তোলনের। একসময় এখানকার বাসিন্দারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য জলাভূমি থেকে টার্ফ সংগ্রহ করতেন। সেই কাজের ফলে তৈরি হয় গর্ত, জলাধার ও খাল। সময়ের সঙ্গে সেই জলপথই গড়ে তোলে আজকের গিথহর্নের স্বতন্ত্র ভূদৃশ্য।
গ্রামের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ বছর আগে এখানে বসতি গড়ে ওঠে। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, প্রথম দিকের বাসিন্দারা প্রচুর বুনো ছাগলের শিং খুঁজে পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই জায়গাটির প্রাচীন নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
আজ গিথহর্নে কয়েক হাজার মানুষের বসবাস। পর্যটকেরাও সারা বছর এখানে ভিড় করেন। কেউ আসেন নৌকায় গ্রামের খাল ঘুরতে, কেউ হাঁটেন সেতু পেরিয়ে, কেউ আবার সাইকেলে ঘুরে দেখেন জলঘেরা জনপদটি।
তবে গিথহর্নের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো—এখানে নৌকা শুধু ঘোরার বাহন নয়, গ্রামের ইতিহাস ও পরিচয়েরও অংশ। একসময় মানুষের প্রয়োজনেই যে খাল খোঁড়া হয়েছিল, সেই খালই শত শত বছর পর এনে দিয়েছে পর্যটক আর বিশ্বজুড়ে পরিচিতি।
তাই গিথহর্নে গেলে , চোখ চলে যায় পানির দিকে। এখানে পথ কখনো মাটির ওপর দিয়ে যায়, কখনো পানির ওপর দিয়ে। আর সেই পথের সবচেয়ে পুরোনো সঙ্গী—নৌকা।
সূত্র: গিথহর্ন ডটকম, হল্যান্ড ডটকম, টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল আমস্টারডাম ডটকম




