যখন ছাতা হাতে পুরুষ মানেই ছিল বিদ্রূপ

একসময় ইংল্যান্ডে ছাতা ব্যবহার করাই ছিল হাস্যকর।
বৃষ্টি নামলেই আমরা মেলে ধরি ছাতা। এ আর এমন কি!
কিন্তু একসময় ইংল্যান্ডে ছাতা ব্যবহার করাই ছিল হাস্যকর, এমনকি লজ্জাজনক বলে মনে করা হতো। বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে। শুধু তাই নয়, ছাতা হাতে রাস্তায় বের হলে মানুষ বিদ্রূপ করত, গালমন্দ করত, এমনকি আবর্জনাও ছুড়ে মারত। এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম প্রকাশ্য পুরুষ ছাতা ব্যবহারকারী হিসেবে পরিচিত জোনাস হ্যানওয়ে।
ঘটনাটি ঘটে ১৭৫০-এর দশকের শুরুতে। ফ্রান্স সফর শেষে লন্ডনে ফিরে এসে হ্যানওয়ে নিয়মিত ছাতা নিয়ে বের হতে শুরু করেন। সে সময় ইংল্যান্ডে পুরুষদের ছাতা ব্যবহারকে দুর্বলতা ও নারীত্বের প্রতীক বলে মনে করা হতো। পথচারীরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত, কেউ কেউ উচ্চৈঃস্বরে বিদ্রূপ করত। যেন ছাতা নয়, তিনি কোনো ভয়ংকর সামাজিক অপরাধ করছেন।
ফরাসি ফ্যাশন থেকে সামাজিক নিষেধাজ্ঞা
ছাতাকে আরও একটি কারণে অপছন্দ করত ইংরেজরা। তাদের কাছে এটি ছিল ‘অতিরিক্ত ফরাসি’ জিনিস। আর ইংরেজ- ফরাসি সাংস্কৃতিক দ্বৈরথ তো বহুদিনের পুরনো। মূলত রোদ থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহৃত প্যারাসল থেকেই আধুনিক ছাতার ধারণা আসে। ১৮০০ শতকের শুরুতে ফরাসি উদ্ভাবক জ্যাঁ মারিউস হালকা ও ভাঁজ করা যায় এমন ছাতা তৈরি করেন। পরে সেটি বৃষ্টিতেও ব্যবহার শুরু হয় এবং ফ্রান্সের অভিজাত নারীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই ইংল্যান্ডে কেউ ছাতা ব্যবহার করলে অনেকেই তাকে ব্যঙ্গ করে ‘ফরাসি বাবু’ বলে ডাকত।
তবে জোনাস হ্যানওয়ে ছিলেন একগুঁয়ে স্বভাবের মানুষ। সমালোচনায় তিনি খুব একটা কান দিতেন না; বরং নিজের মতো করে চলতেই পছন্দ করতেন। জীবনে আরও নানা বিতর্কে তিনি জড়িয়েছেন। এমনকি একসময় ইংল্যান্ডে চা পান জনপ্রিয় হওয়ারও বিরোধিতা করেছিলেন এবং এ নিয়ে বইও লিখেছিলেন।
একটি ছাতাই বদলে দিল ইংল্যান্ডের বৃষ্টির দিন
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়তে হয় ঘোড়ার গাড়ির চালকদের কারণে। সে সময় বৃষ্টির দিনে মানুষ ভিজে যাওয়ার ভয় এড়াতে ঘোড়ার গাড়ি বা পালকিতে চড়ত। ফলে বৃষ্টি মানেই তাদের বাড়তি আয়; কিন্তু ছাতা ব্যবহার শুরু হলে মানুষ হেঁটেও শুকনো থাকতে পারবে। তাই চালকরা মনে করত, হ্যানওয়ের ছাতা তাদের ব্যবসার জন্য হুমকি।
ফলে তাকে প্রায়ই নোংরা জিনিস ছুড়ে মারা হতো। একবার তো একজন ঘোড়ার গাড়ির চালক ইচ্ছা করে তার ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ারও চেষ্টা করেন। হ্যানওয়ে অবশ্য দমে যাননি। উল্টো নিজের ছাতা দিয়েই চালককে ভালোভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন বলে সমসাময়িক বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। হ্যানওয়ের সাহস দেখে আরও মানুষ ছাতা ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে একের পর এক মানুষ প্রকাশ্যে ছাতা নিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ১৭৮৬ সালে হ্যানওয়ের মৃত্যুর সময় ছাতা আর অদ্ভুত কোনো বস্তু ছিল না; বরং প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন সঙ্গী হয়ে উঠছিল।
তার মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস পর লন্ডনের একটি পত্রিকায় নতুন ধরনের ছাতার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বোঝাই যাচ্ছিল, ছাতা আর সাময়িক ফ্যাশন নয়, বরং মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গেছে।
আজ বৃষ্টির দিনে ছাতা খুলে হাঁটার সময় খুব কম মানুষই ভাবেন, এই সাধারণ অভ্যাসটিকে একসময় সামাজিক বিদ্রূপের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছিল। আর সেই লড়াইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন জোনাস হ্যানওয়ে— যিনি প্রমাণ করেছিলেন, অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হয় কখনো কখনো একটি ছোট্ট ছাতা দিয়েই।
সূত্র: অ্যাটলাস অবসকিউরা






