‘রহস্যময় লেক’ স্পর্শ করলেই অবয়ব হয় পাথরের মতো!

ছবি: জুমিয়া ট্রাভেলস কেনিয়া
পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নদী ও হ্রদকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হয়। সনাতন ধর্মে গঙ্গা-যমুনা কিংবা মানস সরোবর, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মে জর্ডান নদী, কিংবা কলম্বিয়ার এল ডোরাডোর উপকথা জড়ানো লেক গুয়াতাভিতা- সবই মানুষের আস্থার প্রতীক। কিন্তু এই পবিত্র জলাশয়গুলোর ভিড়ে তানজানিয়ায় রয়েছে এমন এক হ্রদ, যা চরম রহস্যময় এবং একই সাথে অত্যন্ত প্রাণঘাতী।
লেকটির নাম ‘লেক নেট্রন’। ওপর থেকে দেখলে টকটকে লাল দেখায় এই হ্রদের পানি। তবে এর সবচেয়ে অদ্ভুত ও গা ছমছমে বৈশিষ্ট্য হলো- এর সংস্পর্শে আসা যেকোনো পশুপাখির মৃতদেহ পরিণত হয় পাথরের মতো শক্ত মূর্তিতে।
প্রায় ১৫ লাখ বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা ও টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল এই লেক নেট্রন। এর ঠিক পাশেই রয়েছে মাশাই উপজাতিদের পবিত্র পর্বত ‘ওল ডইনিও লেঙ্গাই’।
এই হ্রদের পানি বাইরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, ফলে আশেপাশের পাহাড় থেকে ধুয়ে আসা ক্ষারীয় খনিজ, মূলত সোডিয়াম কার্বনেট ও ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট এখানে এসে জমতে থাকে। তীব্র গরমে পানি বাষ্পীভূত হয়ে খনিজগুলোর ঘনত্ব এখানে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং গ্রীষ্মকালে এখানকার পানির তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
২০১৩ সালে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী নিক ব্র্যান্ট তাঁর একটি বইয়ে এই হ্রদের তীরে পড়ে থাকা পাখি ও বাদুড়ের কিছু চমকপ্রদ ছবি প্রকাশ করেন। সেই মৃতদেহগুলো দেখতে হুবহু পাথরের মূর্তির মতো লাগছিল, যেন হ্যারি পটার সিনেমার কোনো জাদুতে তারা জমে গেছে।
বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়, এই হ্রদের পানির পিএইচ মাত্রা প্রায় ১০ দশমিক ৫, যা অত্যন্ত ক্ষারীয় এবং যেকোনো সাধারণ প্রাণীর চোখ ও ত্বক মুহূর্তেই পুড়িয়ে দিতে পারে। হ্রদের পানিতে থাকা উচ্চমাত্রার সোডিয়াম কার্বনেট মূলত প্রিজারভেটিভ হিসেবে কাজ করে। প্রাচীন মিশরে মমি তৈরিতেও এটি ব্যবহৃত হতো। যখন কোনো পাখি বা প্রাণী এই পানিতে পড়ে মারা যায়, তখন পানিটি তাদের শরীরের চর্বি ও আর্দ্রতা শুষে নেয়। ফলে মৃতদেহগুলো পচে না গিয়ে মমি বা পাথরের মতো শক্ত অবয়বে যুগের পর যুগ টিকে থাকে।
এত প্রাণঘাতী হওয়া সত্ত্বেও এই হ্রদ কিন্তু সম্পূর্ণ প্রাণহীন নয়। পানিতে থাকা প্রচুর পরিমাণে লবণপ্রিয় অণুজীব এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়ার (নীল-সবুজ শৈবাল) কারণে এই হ্রদের পানি লাল দেখায়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিষাক্ত হ্রদই লাখ লাখ ‘লেসার ফ্ল্যামিঙ্গো’ পাখির প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। এই পাখিগুলো হ্রদের ক্ষারীয় পানি সহ্য করতে পারে এবং এখানকার লাল শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে।
যেহেতু অন্য কোনো হিংস্র শিকারি প্রাণী এই হ্রদের সীমানায় ঘেঁষতে পারে না, তাই ফ্ল্যামিঙ্গোদের জন্য এটি প্রকৃতির সবচেয়ে সুরক্ষিত ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রজনন মৌসুমে লাখ লাখ গোলাপি ফ্ল্যামিঙ্গোর মেলা বসে এই রহস্যময় লাল হ্রদের বুকে।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স




