নাম তার চামেরি হাউস!

চামেরি হাউস স্থানীয়দের কাছে ‘চামেলী হাউস’ নামে পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার তোপখানা রোডে সরকারি দপ্তর ও ব্যস্ত সড়কের মাঝেও চোখে পড়ে লাল ইটের দেয়াল, কাঠের কাঠামো, ঢালু টালির ছাদ আর সবুজ প্রাঙ্গণঘেরা একটি ভবন। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও সচিবালয়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি যেন নগরের বুকে ইতিহাসের এক টুকরো।
আপনি যদি কখনো তোপখানা রোড দিয়ে হেঁটে গিয়ে থাকেন এবং হঠাৎ রাস্তার পাশের কোনো স্থাপনার দিকে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে সম্ভবত সেটি এই ভবনটিই। স্থানীয়দের কাছে ভবনটি ‘চামেলী হাউস’ নামে পরিচিত। তবে গুগল ম্যাপ ও সরকারি সাইনবোর্ডে এর নাম ‘চামেরি হাউস’ (Chummery House)। নামের এই পার্থক্যের আড়ালেই রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এক বিশেষ আবাসনসংস্কৃতির ইতিহাস।
‘Chummery’ একটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শব্দ। ইংরেজি ‘Chum’ অর্থ বন্ধু; এর সঙ্গে ‘-ery’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে শব্দটি গঠিত। ঔপনিবেশিক আমলে বাড়ি থেকে দূরে কর্মরত অবিবাহিত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সম্মিলিত আবাসন বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হতো। ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও রেঙ্গুন (ইয়াঙ্গুন) ও কলম্বোর মতো শহরে এমন আবাসন ছিল। ধারণা করা হয়, ঢাকার চামেরি হাউসও বিশ শতকের শুরুতে অবিবাহিত ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আবাসস্থল হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের শাসনকর্তা লর্ড কার্জনের নির্দেশে ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। বাংলা বিভক্ত করার ধারণাটি অবশ্য লর্ড কার্জন থেকে শুরু হয়নি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল ১৭৬৫ সাল থেকে বিহার ও ওড়িশা বাংলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে সরকারি প্রশাসনিক এলাকা হিসেবে বাংলা অতিরিক্ত বড় হয়ে যায় এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে এটির সুষ্ঠু শাসনক্রিয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। বঙ্গভঙ্গের সূত্রপাত মূলতঃ এখান থেকেই।
ঢাকার রমনা এলাকাকে কেন্দ্র করে সেসময় প্রশাসনিক স্থাপনা নির্মাণ ও পরিকল্পিত নগরায়ণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কার্জন হল, বঙ্গভঙ্গের পর নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের লেফট্যানেন্ট গভর্নরের সরকারি বাসভবন (গভর্নর হাউস) যা পুরাতন হাইকোর্ট বিল্ডিং নামে সর্বাধিক পরিচিত এবং চামেরি হাউসকে সেই সময়ের নগর উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়। ঢাকার পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পরিকল্পনাকারী বা ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার হিসেবে ব্রিটিশ স্থপতি রবার্ট লুইস প্রাউডলকের (Robert Louis Proudlock) নাম বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
চামেরি হাউসের ইতিহাস ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আবাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বারং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘ঢাকা কোষ’ এবং ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে চামেরি হাউসে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জন্য বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু (এস এন বোস) সহ কয়েকজন শিক্ষক বসবাস করতেন। ১৯২৬ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আবাসনসংকট দেখা দিলে কয়েকজন ছাত্রকেও ভবনটিতে স্থানান্তর করা হয়। পরে এটি ছাত্রীনিবাস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। অন্য একটি বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৩৮ সালের মধ্যে ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক ভবনে রূপান্তরিত হয়েছিল। অর্থাৎ, চামেরি হাউসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জীবন, আবাসনসংকট এবং তৎকালীন নগরজীবনের নানা অধ্যায়। সময়ের সঙ্গে ব্যবহার বদলালেও ভবনটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
চামেরি হাউসকে সাধারণত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। তবে এর কাঠের কাঠামো, ঢালু ছাদ, প্রশস্ত কার্নিশ ও বহুভুজাকৃতির কোণার টাওয়ার মধ্য ইউরোপীয় কাঠনির্ভর স্থাপত্যরীতির কথাও মনে করিয়ে দেয়। ঢাকায় এমন স্থাপত্যের নিদর্শন বিরল। ভবনটির ছাদ মূলত লাল টালিতে আবৃত ছিল। খাড়া ঢাল ও প্রশস্ত কার্নিশ সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি বৃষ্টি থেকে সুরক্ষাও দিত। নিচু ও আড়াআড়ি গঠন, ছায়াঘেরা বারান্দা, খিলানযুক্ত খোলা অংশ এবং সরল নকশার স্তম্ভ একে দিয়েছে স্বতন্ত্র রূপ। কাঠের কাঠামো, ঢালু ছাদ ও খোলা প্রাঙ্গণের সমন্বয়ে এতে ইউরোপীয় নির্মাণরীতির প্রভাবের সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশের উপযোগিতাও ফুটে উঠেছে।
৬ জুলাই ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র-সিরডাপের (CIRDAP) সদর দপ্তর ১৯৮৫ সালে ঢাকার তোপখানা রোডের ঐতিহাসিক চামেরি হাউসে হস্তান্তরিত হয়। বর্তমানে এখানে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রও রয়েছে।
সময়ের সঙ্গে ভবনটির মূল নকশা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯৫ সালে পেছনে একটি দোতলা সম্মেলনকক্ষ নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালে স্বচ্ছ সীমানাপ্রাচীরের বদলে অস্বচ্ছ দেয়াল নির্মিত হলে রাস্তা ও সবুজ পরিবেশের সঙ্গে ভবনটির দৃশ্যগত সংযোগ কমে যায়। ২০০৬ সালে ছাদ সংস্কারের সময় মূল নির্মাণসামগ্রী কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
আধুনিক ঢাকা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নতুন সড়ক, উঁচু ভবন ও আধুনিক অবকাঠামোর ভিড়ে পুরোনো স্থাপনা ও ঐতিহাসিক স্মৃতি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ একটি শহরের পরিচয় শুধু নতুন নির্মাণে নয়- তার অতীত, শিক্ষা, নগরায়ণ, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মধ্যেও নিহিত। চামেরি হাউসের গুরুত্ব তাই শুধু এর বয়সে নয়। নামের উৎস, স্বতন্ত্র স্থাপত্যরীতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনের স্মৃতি এবং সময়ের সঙ্গে ব্যবহারের পরিবর্তন-সব মিলিয়ে এটি ঢাকার ইতিহাসের বহুমাত্রিক সাক্ষী।
ভবনটির মূল কাঠামো ও স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই এবং সাধারণ মানুষের কাছে এর প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা জরুরি। কারণ, ঐতিহাসিক স্থাপনা হারালে শুধু একটি ভবন নয়, একটি শহরের অতীত জানার গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও হারিয়ে যায়।
তাই তোপখানা রোডের চামেরি হাউস তাই শুধু একটি পুরোনো ভবন নয় এটি ঢাকার নগরায়ণ, শিক্ষার ইতিহাস ও স্থাপত্য-ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। এই দলিল সংরক্ষণ করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অতীতের জানালা খোলা রাখা।
লেখক
সিনিয়র তথ্য অফিসার
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়




