পুতিনকে ভয় পায় মানুষ, কেন বলছেন গ্ল্যামারাস ব্লগার

ব্লগার ভিক্টোরিয়া বোনিয়া ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন গ্ল্যামারাস ব্লগার। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তা যখন ক্রমাগত কমছে, ঠিক তখনই তার সরকারের সমালোচনা করে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন ভিক্টোরিয়া বোনিয়া। এই ভিডিওটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে। এর জবাব দিতে হয়েছে খোদ ক্রেমলিনকে।
ভিক্টোরিয়া বোনিয়া রাশিয়ার বিনোদন জগতের এক পরিচিত নাম। ২০০৬ সালে ‘ডম-২’ নামের একটি রিয়েলিটি শোতে অংশ নিয়ে তিনি হয়ে যান তারকা। বর্তমানে দেশের বাইরে থাকলেও রাশিয়ার মানুষের মনে দারুণ প্রভাব রয়েছে তার। গত সোমবার ১৮ মিনিটের এক ভিডিওতে তিনি সরাসরি পুতিনকে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দেন হুঁশিয়ারি।
ভিক্টোরিয়া তার ভিডিওতে সরাসরি বলেছেন, ‘দেশের মানুষ আপনাকে ভয় পায়। শিল্পী থেকে শুরু করে বড় বড় অফিসার সবাই আপনাকে ডরায়।’ মাত্র চার দিনে তার এই ভিডিওটি ২ কোটি ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ দেখে ফেলেছেন এবং এতে লাইক পড়েছে প্রায় ১৩ লক্ষ। রাশিয়ার মতো দেশে যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন, সেখানে এই ভিডিও রীতিমতো ঘটিয়েছে বিপ্লব।
ভিডিওতে ভিক্টোরিয়া এমন কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন যা আঞ্চলিক নেতারা পুতিনের সামনে বলার সাহস পান না। তিনি দাগেস্তানের বন্যা, সাগরের পানিতে তেলের দূষণ, সাইবেরিয়ায় গবাদি পশুর রোগ এবং ইন্টারনেট কড়াকড়ির মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, দ্রব্যমূল্য আর ট্যাক্সের চাপে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পিঠ ঠেকে গেছে এখন দেয়ালে।
পুতিনকে সতর্ক করে এই ব্লগার আরও যোগ করেন, ‘আপনি কি জানেন ঝুঁকিটা কোথায়? মানুষ যখন ভয় পাওয়া বন্ধ করে দেবে, তখনই বিপদ। জনগণকে এখন কুঞ্চিত স্প্রিংয়ের মতো চেপে ধরা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, কোনো একদিন এই স্প্রিং সজোরে ছিটকে বেরিয়ে আসবে।’
সাধারণত এমন সমালোচনা সরকার গায়ে মাখে না। কিন্তু এবার হয়েছে উল্টো। ক্রেমলিন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে ভিক্টোরিয়া যেসব সমস্যার কথা বলেছেন, সেগুলো সমাধানের কাজ তারা শুরু করে দিয়েছে। কোনো তারকার সমালোচনার পর সরকারের এমন প্রতিক্রিয়া সত্যিই বিরল।
অনেকে মনে করছেন, এটি হয়তো সরকারের কোনো সাজানো নাটক হতে পারে। কারণ ভিক্টোরিয়া সরাসরি যুদ্ধ বা পুতিনকে আক্রমণ করেননি। রাশিয়ার একটি পুরোনো কৌশল আছে পুতিনকে ‘ভালো রাজা’ হিসেবে দেখানো এবং সব দোষ নিচের কর্মকর্তাদের ওপর চাপানো। তবে বিশ্লেষকরা এই তত্ত্ব মানতে নারাজ।
বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই কোলেসনিকভ মনে করেন, মানুষ এখন যুদ্ধের কারণে হাঁপিয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের মাথায় এখন এই চিন্তা ঢুকছে যে, দেশে যা কিছু খারাপ ঘটছে, তার পেছনে রয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি আর ইন্টারনেট বন্ধের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
পুতিনের সাবেক উপদেষ্টা আব্বাস গালিয়ামভ জানান, ভিক্টোরিয়ার মতো সেলিব্রেটিরা রাজনীতিতে কথা বলায় এখন এমন এক দল মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে, যারা আগে এসব নিয়ে ভাবত না। দোকানের জিনিসের দাম বাড়া আর ব্যক্তিগত জীবনে সরকারের নাক গলানো আর সহ্য করছে না সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ শুরু হওয়ার পর পুতিনের ওপর মানুষের আস্থা এখন সবথেকে নিচে নেমে গেছে। গত বুধবার এক মিটিংয়ে পুতিন নিজেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, দেশের অর্থনীতি যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, তেমনটা হচ্ছে না।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, যুদ্ধের পক্ষে থাকা কিছু ব্লগারও এখন পুতিনের ওপর বিরক্ত। তাদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষের কাছে গোপন রাখা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর এই ধীরগতি আর ভুল কৌশলে এখন চটে আছেন খোদ পুতিনের সমর্থকরাই।
ইউক্রেন যুদ্ধের এই উত্তাল সময়ে রাশিয়ার অন্দরমহলের এই চিত্র কি নতুন কোনো ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে? এটাই এখন বড় প্রশ্ন!

