ঘন ঘন ভূমিকম্পে ভয়ে পৃথিবী

ঘন ঘন ভূমিকম্প ভয়ে পৃথিবী। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যেন খেই হারিয়ে ফেলে পৃথিবী। চলতে চলতে পথ হারিয়ে বসে হঠাৎ। কখনো এক সেকেন্ড; কখনো কয়েক সেকেন্ড। ‘শর্ট টার্ম মেমোরি লস’-এর মতো অনেকটা। ‘ভুলে যায় গতিপথ’। অর্থাৎ টেকটোনিক প্লেটের আকস্মিক স্থানান্তর। বড় ধাক্কাটাও আসে তখনই। শুরু হয় ভয়ংকর কম্পন। পরক্ষণেই ছন্দে ফিরে আসে আবার। কিন্তু এই কয়েক সেকেন্ডেই উল্টে যায় সৃষ্টির হিসাব। থেমে যায় একটি শহরের স্বাভাবিক জীবন। কেঁপে ওঠে পায়ের তলার মাটি। নাগরদোলার মতো দুলে ওঠে বহুতল ভবন। বদলে যায় পুরো একটি নগরের মানচিত্র। কখনো মুছে দেয় শত বছরের সভ্যতার চিহ্ন। নিভে যায় শত শত প্রাণ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের এ দৃশ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়— বরং বারবার ফিরে আসা এক বাস্তবতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ‘ঘন ঘন শক্তিশালী ভূমিকম্প’ ভয় ধরিয়ে দিয়েছে পৃথিবীকে। আলোচনার আরেক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে ভূগর্ভের এই টেকটোনিক পাতের সংঘর্ষ। জাপান থেকে তুরস্ক-সিরিয়া, মরক্কোর পাহাড়ি গ্রাম থেকে স্বৈরশাসনে তটস্থ মিয়ানমারের জনপদ— সবখানেই একই দৃশ্য। একই পুনরাবৃত্তি। ধস, প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, মানুষের অসহায়তা! প্রশ্ন উঠছে— পৃথিবী কি সত্যিই আগের চেয়ে বেশি ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে উঠছে? ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ লেটারস’ জার্নালে সেই আভাসই দিয়েছেন জার্মানের পটসডাম ‘জিএফজেড জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস’ এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা। তারা বলেছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন শক্তিশালী ঝড়-সৃষ্টির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজেএস বলছে, পৃথিবীতে এখনো গড়ে প্রায় ২০ হাজার ভূমিকম্প রেকর্ড হয় প্রতি বছর। সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি তথ্য (প্রায় ১৯০০ সাল থেকে) অনুযায়ী, ‘প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬টি বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটে। এর মধ্যে ১৫টি ভূমিকম্পের মাত্রা ৭-এর ঘরে। ৮ দশমিক শূন্য বা তার বেশি হয়ে থাকে একটি।’ ভূমিকম্প বাড়ছে কি না— এ সম্পর্কে ভিন্ন তত্ত্বও রয়েছে বিজ্ঞানে। গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি শুধু অনুভূতির নয়, বরং ব্যাখ্যার। পৃথিবীর ভেতরের টেকটোনিক প্লেটগুলো আজও ঠিক সেই গতিতেই চলছে, যেভাবে চলে আসছে কোটি বছর ধরে। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়— মানুষ এখন বেশি সংখ্যায়। বেশি উচ্চতায় এবং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। ফলে একই ভূমিকম্প এখন আর শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি পরিণত হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক বিপর্যয়ে। বেশ কয়েকটি কারণও সামনে এনেছে বিজ্ঞান।
প্রথমত, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত শহর বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত, দুর্বল বিল্ডিং কোড এবং নিম্নমানের নির্মাণ। তৃতীয়ত, নদীবিধৌত নরম মাটি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি বিস্তার। চতুর্থত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি। বিজ্ঞানে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে, ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, তবে এর ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
শক্তিশালী বিল্ডিং কোড, ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামো, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনসচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবী হঠাৎ বেশি কাঁপছে না; বরং মানুষের তৈরি শহরগুলোই এখন বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে সেই কাঁপুনির সামনে।




