অভিবাসীর সন্তান থেকে প্রথম মুসলিম সিনেটর, কে এই আবদুল এল-সায়েদ?
- ট্রাম্পের ক্রমাগত ধর্মবিদ্বেষী আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে, ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান ও আট বছরের লড়াই শেষে ঐতিহাসিক জয়

একটি নাম। একটি ধর্মীয় পরিচয়। আর সেই পরিচয়কে ঘিরে ঘৃণার দীর্ঘ ছায়া। তাকে কটাক্ষ করে ‘জিহাদি’ বলা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এমনকি বলা হয়েছে, মার্কিন সিনেটে ঢুকতে হলে তাকে 'মেটাল ডিটেক্টর' বা ধাতব অস্ত্র শনাক্তকারী যন্ত্রের মধ্য দিয়ে যেতে হবে! অভিযোগের নিশানায় ছিলেন ৪২ বছরের এক চিকিৎসক। নাম আবদুল এল-সায়েদ। অভিযোগ তুলেছিলেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই মানুষটিই লিখলেন ইতিহাস। যুক্তরাষ্ট্রের ২৩৭ বছরের সিনেটের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে নির্বাচিত হলেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) মিশিগানের ডেট্রয়েটে বিজয়ের ভাষণে এল-সায়েদ বলেছেন, ‘আপনারা আমাকে নিজেদের ঘরে, গির্জায়, ইহুদিদের উপাসনালয়ে স্বাগত জানিয়েছেন।’
আরেকটি কথাও বলেছেন। যারা মনে করেন আমেরিকায় কিছু মানুষের জায়গা নেই, তাদের উদ্দেশে তার জবাব, ‘আমরা জানি, এই আমেরিকা আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট বড়।’
একদিকে ধর্মের পরিচয়ে বিভাজনের রাজনীতি। অন্যদিকে সেই পরিচয় নিয়েই নির্বাচনে জয়। আবদুল এল-সায়েদের জীবন যেন আমেরিকার স্বপ্ন আর সংকটের এক আশ্চর্য প্রতিচ্ছবি।
মিসরের শিকড়, আমেরিকার মাটিতে জন্ম
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের রচেস্টার হিলসে জন্ম আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদের। বাবা মোহাম্মদ এল-সায়েদ মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। পেশায় প্রকৌশলী। মা ফাত্তেন এলকোমিও মিসরীয় বংশোদ্ভূত।
শৈশবে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর বাবার কাছেই বড় হন আবদুল। তার সৎমা জ্যাকলিনের পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে মিশিগানের বাসিন্দা। ফলে শৈশব থেকেই দুই ভিন্ন সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।
একদিকে মিসরীয় মুসলিম পরিবারের ঐতিহ্য। অন্যদিকে আমেরিকার সাধারণ স্কুল, খেলাধুলা আর শহরতলির জীবন।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মেধাবী ছিলেন। বিদ্যালয়ের ফুটবল, কুস্তি ও ল্যাক্রস দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয় অনেক সময় তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলার পর সেই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র হয়।
একবার ফুটবল খেলার মাঠে আরব পরিচয় নিয়ে অপমানিত হয়ে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়কে ঘুষি মেরেছিলেন তিনি। তখন তাঁর প্রশিক্ষক তাঁকে বুঝিয়েছিলেন, সারা জীবন আবদুল এল-সায়েদ নাম নিয়েই বাঁচতে হবে। এই পরিচয়কে অজুহাত বানাবেন, নাকি এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা, সিদ্ধান্ত নিতে হবে নিজেকেই।
সেই কথাটি তার জীবনের গভীরে জায়গা করে নেয়।
অক্সফোর্ড থেকে কলাম্বিয়া, চিকিৎসকের ভেতরে রাজনীতির বীজ
২০০৩ সালে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিষয় জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ২০০৭ সালে সর্বোচ্চ কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক হন।
এরপর চিকিৎসাশিক্ষার পথে যাত্রা। মেধার স্বীকৃতি হিসেবে পান বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ রোডস বৃত্তি। ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন।
২০১১ সালে অক্সফোর্ড থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৪ সালে নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পন্ন করেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ডিগ্রি।
আবদুল এল-সায়েদের ব্যক্তিগত জীবনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে এক নিবিড় সম্পর্ক। তার স্ত্রী ডা. সারা জুকাকু ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সারার পূর্বপুরুষদের বাড়ি ভারতের কর্ণাটকের উপকূলীয় শহর ভাটকলে। তার বাবা চিকিৎসক তৈয়ব জুকাকুও একজন কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আবদুলের সঙ্গে সারার পরিচয়। সেখানকার মুসলিম ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ২০০৬ সালের মে মাসে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। তাদের সংসারে রয়েছে দুই কন্যাসন্তান, এমালি ও সেরিন। বর্তমানে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে মিশিগানের অ্যান আরবার শহরে বসবাস করেন এল-সায়েদ। রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনে সারা থেকেছেন তার পাশে। ২০১৮ সালের নির্বাচনী পরাজয়ের কঠিন সময়েও পরিবার ছিল তার অন্যতম ভরসা।
হাসপাতালের রোগী দেখা কিংবা গবেষণাপত্র প্রকাশের মধ্যেই নিজের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি এল-সায়েদ৷ তার উপলব্ধি ছিল, মানুষের অসুস্থতার পেছনে শুধু জীবাণু নয়, দারিদ্র্য, দূষণ, বৈষম্য আর সরকারি নীতিরও ভূমিকা রয়েছে। সেই চিন্তা থেকেই চিকিৎসকের জীবন তাঁকে নিয়ে যায় জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে।
দেউলিয়া শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার দায়িত্ব
২০১৫ সালে ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নেন আবদুল এল-সায়েদ। তখন তার বয়স মাত্র ৩০ বছর।
আমেরিকার গাড়ি শিল্পের ঐতিহাসিক শহর ডেট্রয়েট ২০১৩ সালে দেউলিয়াত্বের আবেদন করেছিল। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে শহরের স্বাস্থ্যসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন একটি শহরে স্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব নেওয়া সহজ ছিল না।
এল-সায়েদ চেষ্টা করেন স্থানীয় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের। শিশুর স্বাস্থ্য, পরিবেশদূষণ, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো ছিল তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০১৭ সালে সেই দায়িত্ব ছেড়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন চান। সমর্থন পেয়েছিলেন প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ কয়েকজন পরিচিত রাজনীতিকের। কিন্তু মনোনয়নযুদ্ধে হেরে যান গ্রেচেন হুইটমারের কাছে। সেই পরাজয় ছিল বড় ধাক্কা। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাময়িকভাবে থেমে যায়। কিন্তু জনসেবার কাজ ছাড়েননি।
২০২৩ সালে মিশিগানের ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও সাবেক সেনাসদস্যদের কল্যাণ বিভাগের দায়িত্ব নেন। তাঁর নেতৃত্বে চিকিৎসার ঋণের বোঝা কমাতে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচি নেওয়া হয়। শিশুদের বিনামূল্যে চশমা সরবরাহ, বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণেও কাজ করেছেন।
চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে লিখেছেন বই। পরিচালনা করেছেন জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান। মানুষের স্বাস্থ্য আর রাজনীতির সম্পর্ক তাঁর লেখালেখিরও প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের নিশানায় ধর্মীয় পরিচয়
২০২৬ সালে আবার নির্বাচনের মাঠে নামেন এল-সায়েদ। এবার লক্ষ্য মার্কিন সিনেট।
আগস্টে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়নযুদ্ধে পরাজিত করেন প্রভাবশালী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে। এরপর শুরু হয় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের সঙ্গে লড়াই।
কিন্তু নির্বাচনী বিতর্ক শুধু কর, চিকিৎসা কিংবা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আক্রমণের কেন্দ্রে চলে আসে তার মুসলিম পরিচয়। গত ২৫ অক্টোবর মিশিগানের পোর্ট হিউরনে নির্বাচনী সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ‘জিহাদি’ এবং ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য’ বলে আখ্যা দেন। এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার প্রসঙ্গ টেনে তাঁকে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল, এল-সায়েদ সিনেটর হলে তাঁকেই কেবল অস্ত্র শনাক্তকারী যন্ত্রের মধ্য দিয়ে সিনেটে ঢুকতে হবে।
রিপাবলিকানদের কয়েকজন নেতা আরও এগিয়ে যান। আলাবামার সিনেটর টমি টিউবারভিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ‘সন্ত্রাসী’ এবং ‘উগ্র ইসলামপন্থী’ বলে আক্রমণ করেন।
মার্কিন তথ্যযাচাই প্রতিষ্ঠান পলিটিফ্যাক্ট ২৭ অক্টোবর জানিয়েছে, এল-সায়েদ কখনও মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন না। ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য সহিংসতার পক্ষেও অবস্থান নেননি। ট্রাম্পের দাবিকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে চিহ্নিত করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলে তাঁকে নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ক্রমেই উঠে আসে তাঁর ধর্ম।
এল-সায়েদের জন্য আক্রমণগুলো শুধু রাজনৈতিক ছিল না। তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। আগের নির্বাচনী প্রচারেও মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন তিনি৷
তবু রাজনৈতিক আক্রমণের জবাবে তিনি নিজের পরিচয় আড়াল করেননি। বরং বারবার বলেছেন, তার নাম, ধর্ম কিংবা বংশপরিচয় নয়, মানুষের চিকিৎসা, কাজের সুযোগ ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েই রাজনীতির আলোচনা হওয়া উচিত।
ফিলিস্তিনের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান
আবদুল এল-সায়েদের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফিলিস্তিনের প্রতি তার সমর্থন।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মার্কিন করদাতাদের অর্থে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন।
তার দাবি, বিদেশের যুদ্ধের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বদলে সেই অর্থ আমেরিকার সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।
ফেব্রুয়ারিতে রমজান মাসে মিশিগানের ফ্লিন্ট এলাকার একটি মসজিদে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, অন্য কোথাও বোমা ফেলার জন্য ব্যয় করা অর্থ মানুষের চিকিৎসা কিংবা বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় করা সম্ভব হতো।
ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক অভিযানেরও বিরোধিতা করেছেন তিনি।
ফিলিস্তিনের পক্ষে এই অবস্থান তাকে প্রগতিশীল তরুণ এবং মিশিগানের বহু আরব ও মুসলিম ভোটারের কাছে পরিচিত করে তোলে।
তবে তার অবস্থান নিয়ে ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যেও বিরোধিতা ছিল। ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক অর্থায়নকারী গোষ্ঠীগুলো তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
ইসরায়েলপন্থী সংগঠন এআইপ্যাকের সংশ্লিষ্ট প্রচারে ডেমোক্র্যাট মনোনয়নযুদ্ধেই প্রায় তিন কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল বলে জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
তার অবস্থান ছিল, ইসরায়েল সরকারের নীতির সমালোচনা এবং ইহুদিবিদ্বেষ এক বিষয় নয়। ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেছেন।
আট বছরের পরাজয় থেকে ঐতিহাসিক বিজয়
এবারের নির্বাচনেও তার সামনে বাধা কম ছিল না। মাইক রজার্স ছিলেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা। তার পেছনে ছিল ট্রাম্প ও জাতীয় রিপাবলিকান নেতৃত্বের সমর্থন।
অন্যদিকে এল-সায়েদের প্রচারে গুরুত্ব পায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসা, আবাসনের ব্যয়, ধনকুবেরদের ওপর কর এবং রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অর্থের প্রভাব কমানোর দাবি।
বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেস এবং ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব তার পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।
অবশেষে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আসে সেই প্রতীক্ষিত নির্বাচন৷ বুধবার ভোরে এপি জানায়, মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন আবদুল এল-সায়েদ। পরাজিত হয়েছেন মাইক রজার্স।
সেই সঙ্গে তৈরি হলো মার্কিন ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।
এর আগে মুসলিমরা মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়েছেন। কিথ এলিসন, আন্দ্রে কারসন, ইলহান ওমর ও রাশিদা তালিবের মতো রাজনীতিকেরা জাতীয় আইনসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের পথ তৈরি করেছেন।
কিন্তু সিনেটের ইতিহাসে এই প্রথম নির্বাচিত হলেন একজন মুসলিম। মিশিগানের ডেট্রয়েটে বিজয়ী সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে এল-সায়েদ স্মরণ করলেন দীর্ঘ প্রচারের কথা। বড় শহর থেকে ছোট শহর। মানুষের ঘর থেকে উপাসনালয়। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
আর যারা তার ধর্মীয় পরিচয়কে আক্রমণের অস্ত্র বানিয়েছিলেন, তাদের উদ্দেশে তার বক্তব্য ছিল, তারা বিভাজনকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু মানুষ দেখিয়েছেন, আমেরিকার পরিসর আরও বড়।
ইতিহাসের সামনে নতুন প্রশ্ন
এল-সায়েদের বিজয় অবশ্য শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের গল্প নয়। এটি একজন চিকিৎসকের রাজনীতিতে আসার গল্প। একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তানের নিজ দেশের সর্বোচ্চ আইনসভার একটি কক্ষে পৌঁছানোর গল্প। আট বছর আগে পরাজিত হয়ে আবার ফিরে আসার গল্প।
তার সামনে এখন আরও কঠিন পরীক্ষা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করা, নিজ দলের মতপার্থক্য সামলানো এবং নিজের সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করা।
অবশ্য তার পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এখানেই শেষ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রায় আড়াই দশক আগে ফুটবল মাঠে নিজের নাম ও পরিচয় নিয়ে অপমানিত হয়েছিলেন যে কিশোর, আজ সেই নামই লেখা হচ্ছে মার্কিন সিনেটের নির্বাচনী ইতিহাসে।
যে দেশের প্রেসিডেন্ট তাকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে আক্রমণ করেছিলেন, সেই দেশের ভোটারদের একটি অঙ্গরাজ্য তাকেই নির্বাচিত করেছে সিনেটর হিসেবে।
আবদুল এল-সায়েদের এই যাত্রা তাই একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়। মানুষের যোগ্যতা বিচার করবে তার কাজ, নাকি তার নাম আর প্রার্থনার ধরন? মিশিগানের নির্বাচনী ফল অন্তত দেখাল, পরিচয় নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে মানুষের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করে কে তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন।



