স্টারমারকে ট্রাম্পের কটাক্ষ: দেরিতে আসা মিত্রের দরকার নেই

সংগৃহীত ছবি
ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে কটাক্ষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুদ্ধ আমরা জিতে যাওয়ার পর যারা যোগ দিতে আসে, এমন মিত্রের দরকার নেই, বলে যুক্তরাষ্ট্রকে কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বোমারু বিমান যুক্তরাজ্যে পৌঁছে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার শুরু করার পর ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এগুলো নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের অংশ। এখন পর্যন্ত চারটি মার্কিন বোমারু বিমান যুক্তরাজ্যে অবতরণ করেছে। এর মধ্যে ১৪৬ ফুট দীর্ঘ একটি বি–১ ল্যান্সার বোমারু বিমান শুক্রবার সন্ধ্যায় গ্লুচেস্টারশায়ারের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিতে নামে। পরদিন সকালে আরও তিনটি বিমান সেখানে পৌঁছায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘যুক্তরাজ্য, আমাদের একসময়ের মহান মিত্র, হয়তো সবচেয়ে বড় মিত্র, অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। ঠিক আছে, প্রধানমন্ত্রী স্টারমার, এখন আর আমাদের তাদের দরকার নেই, তবে আমরা মনে রাখব। আমরা এমন মানুষদের প্রয়োজন মনে করি না, যুদ্ধে আমরা জিতে যাওয়ার পর যারা তাতে যোগ দেয়।’
এমন এক সময়ে ট্রাম্পের এই মন্তব্য করেছেন যখন যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলস মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রণতরীটির প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর আগেও ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হামলার অনুমোদন না দেওয়ায় স্টারমারের সমালোচনা করেছেন। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ বলে মন্তব্য করেন এবং সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের অবস্থানকে খুবই হতাশাজনক বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা ছাড়াই ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল বলে ভর্ৎসনা করেন।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিট দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্যের ইঙ্গিত উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিশেষ সম্পর্ক এখনও কার্যকর রয়েছে এবং দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান ও সামরিক তৎপরতায় সমন্বয় বজায় রাখছে।
পরে স্টারমার প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। এর মধ্যে রয়েছে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি।
এদিকে অঞ্চলটিতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতিও বাড়াচ্ছে যুক্তরাজ্য। আকাশপথে নজরদারির জন্য একটি মার্লিন হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জর্ডান, কাতার ও সাইপ্রাসে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে আরএএফের ইউরোফাইটার টাইফুন ও এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েনের জন্য রয়্যাল নেভির ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস ড্রাগনকেও প্রস্তুত করা হচ্ছে।
অপরদিকে, যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সাইয়েদ আলী মুসাভি লন্ডনকে সংঘাতে আরও জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘যুক্তরাজ্য যদি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যোগ দেয়, তবে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার থাকবে,’ বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে বলছিলেন তিনি।
‘আমরা আশা করি ব্রিটিশ সরকারসহ অন্যরা তাদের পদক্ষেপে খুব সূক্ষ্মভাবে এবং খুব সতর্কভাবে এগোবে,’ যোগ করেন ইরানি কূটনীতিক।
যুক্তরাজ্য সরাসরি হামলায় অংশ নেয়নি, এ বিষয়টিকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন মুসাভি। তবে, ইরানি জাতির বিরুদ্ধে যদি কোনো স্থাপনা, সম্পত্তি বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ইরান তার প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাতে চায় না এবং সে বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আগ্রহ রয়েছে। তবে হামলা চলতে থাকলে প্রতিক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন মুসাভি। ‘এই আগ্রাসন যদি চলতে থাকে, তাহলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমরা নিজেদের রক্ষা করব। আর যদি তারা এসব সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে চায়, যদিও আমরা তা চাই না, তাহলে সেক্ষেত্রেও আমরা সে অনুযায়ী আত্মরক্ষা করব।’
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর সংঘাত এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এর জবাবে ইরান পুরো অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, বাহরাইন, ওমান ও ইরাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে বা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সাইপ্রাসে অবস্থিত একটি রয়্যাল এয়ার ফোর্স ঘাঁটিও হামলার শিকার হয়েছে।
পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে অঞ্চলগুলো থেকে পাওয়া খবরে ইঙ্গিত মিলছে, ইরানের হামলা এখনো থামেনি। শনিবার কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা তাদের লক্ষ্য করে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের এসব আঞ্চলিক হামলা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিচারে হচ্ছে। তবে তেহরানের দাবি, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের আত্মসমর্পণের দাবিও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের নেতৃত্ব জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে এই যুদ্ধও চলতে থাকবে।

