ইরান যুদ্ধে অস্বস্তিকর পাঠ পেল যুক্তরাষ্ট্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় অর্ধশতক ধরে ইরান যেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বুকে আটকে থাকা এক পুরনো কাঁটা। একেকজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছেন, একেক রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন— কেউ চাপ বাড়িয়েছেন, কেউ যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন, কেউ নিষেধাজ্ঞার জাল আরও শক্ত করেছেন, কেউ আবার আলোচনার টেবিলে বসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই কাঁটা উপড়ে ফেলা যায়নি। বরং প্রতিবারই নতুন কোনো ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে ওয়াশিংটনের জন্য।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধে যে আগুন জ্বলছে, তার ধোঁয়া যেন সীমান্তের রেখা মুছে দিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। ড্রোনের গুঞ্জন, ক্ষেপণাস্ত্রের বিকট শব্দ আর তেলের স্থাপনায় আগুন— যুদ্ধ এখন শুধু রণক্ষেত্রে নেই; ঢুকে পড়েছে বন্দর, বিমানবন্দর, অর্থনীতি আর মানুষের ভবিষ্যতের ভেতর। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ থামলে যেন থমকে যায় বিশ্বের জ্বালানির স্পন্দন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ইতিহাস বদলাবে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, আগের প্রেসিডেন্টরা যেখানে শুধু কথা বলেছেন, সেখানে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। সামরিক শক্তিতে ইরানকে ভেঙে ফেলা হবে, প্রয়োজনে বদলে দেওয়া হবে দেশটির ক্ষমতার কাঠামোও। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় যুদ্ধের ধোঁয়া কাটতে না কাটতেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। যে যুদ্ধে ইরানকে কোণঠাসা করার কথা ছিল, সেটিই এখন মার্কিন কৌশলকে ঠেলে দিয়েছে এক অস্বস্তিকর অচলাবস্থায়।
যুদ্ধ ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে নিশ্চিহ্ন করেছে। তবু তেহরান ভেঙে পড়েনি। বরং ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তারা শিখেছে টিকে থাকার নতুন পাঠ। যুক্তরাষ্ট্রও বুঝেছে, আকাশ থেকে বোমা ফেলে একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করা যায়, কিন্তু তার রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিকে সহজে আত্মসমর্পণ করানো যায় না।
এখন ট্রাম্পের নতুন অস্ত্র অর্থনৈতিক অবরোধ। ইরানের বন্দর ঘিরে চাপ, বাণিজ্যের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা, নিষেধাজ্ঞার আরও কঠোর বেড়াজাল— সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের ভাষায় এটি সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযানগুলোর একটি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কি সত্যিই ইরানকে নতজানু করবে, নাকি শেষ পর্যন্ত উল্টো যুক্তরাষ্ট্রকেই আরও দুর্বল অবস্থানে ফেলবে?
কারণ ইরানও এখন জানে, তার হাতে পাল্টা চাপ তৈরির অস্ত্র আছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম করিডর। সেই পথ অচল করে দেওয়া বা উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলার ক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। আর সেই ক্ষমতা ব্যবহার হলে যুদ্ধের অভিঘাত আর মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় আটকে থাকে না; তার ঢেউ গিয়ে লাগে বিশ্ববাজারে, জ্বালানির দামে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিকের পকেটেও।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বহুদিন ধরেই মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে— সামরিক হুমকি এবং অর্থনৈতিক চাপ। ধারণাটি ছিল সহজ; শক্তির ভয় দেখাও, অর্থনীতির শ্বাসরোধ করো, একসময় তেহরান নতি স্বীকার করবে। কিন্তু প্রায় ৪৭ বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, বাস্তবতা এত সরল নয়।
ইরান এক অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্রের রাষ্ট্র। একদিকে তার বিপ্লবী আদর্শ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান; অন্যদিকে প্রয়োজনের মুহূর্তে বাস্তববাদী সমঝোতার ক্ষমতা। ২০১৫ সালে পরমাণু কর্মসূচিতে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া হোক কিংবা ২০২৩ সালে বহু দশকের বৈরিতা পেছনে ফেলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা— তেহরান বারবার দেখিয়েছে, আদর্শ ও স্বার্থের মাঝখানে চলার পথ তারা খুঁজে নিতে পারে।
কিন্তু ওয়াশিংটনের নীতি প্রায়ই এই জটিলতাকে সরল সমীকরণে নামিয়ে এনেছে— ‘আমাদের পথে আসো, নইলে চাপ বাড়বে।’
সেখানেই হয়তো সবচেয়ে বড় ভুল। সামরিক চাপ ইরানকে অতীতে কখনো কখনো সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করেছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও দেশটির অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। কিন্তু চাপ কখনো ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাইরের হুমকি ইরানের ক্ষমতাসীন ব্যবস্থাকে দেশের ভেতরে আরও প্রতিরোধী করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট বেড়েছে, অথচ ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আসেনি।
সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই পুরনো বাস্তবতাকেই আরও নির্মমভাবে সামনে এনেছে। ইরান শিখেছে, ভয়াবহ বিমান হামলা সহ্য করেও টিকে থাকা সম্ভব। তারা দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী ইরানের মতো বিশাল ও জটিল দেশে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনে যেতে আগ্রহী নয়। আর ওয়াশিংটনও শিখেছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তার মূল্য শুধু মিসাইলের মজুদ কমে যাওয়ায় নয়— জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক চাপেও দিতে হয়।
এ কারণে ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপের’ কৌশল আজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মুখে। চাপ বাড়াতে গেলে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। সেই প্রতিক্রিয়ার অর্থনৈতিক ধাক্কা যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপরই ফিরে আসে, তবে ওয়াশিংটনের জন্য চাপ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠবে। অর্থাৎ যে অস্ত্র দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার কথা ছিল, সেই অস্ত্র ব্যবহারের খরচই ক্রমে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য।
তাই ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো সামরিক বিজয় বা অর্থনৈতিক অবরোধের সাফল্যে নয়; বরং একটি অস্বস্তিকর সত্যে লুকিয়ে আছে— চাপ সব সমস্যার সমাধান নয়। কখনো চাপ প্রতিপক্ষকে নরম করে, আবার কখনো তাকে আরও শক্ত করে তোলে। কখনো নিষেধাজ্ঞা আলোচনার টেবিলে আনে, আবার কখনো সেই টেবিলই ভেঙে দেয়।
ওয়াশিংটনের সামনে এখন তাই পুরনো কৌশলপত্র ছিঁড়ে নতুন করে ভাবার সময়। শুধু আরও চাপ, আরও নিষেধাজ্ঞা আরও সামরিক হুমকি দিয়ে ইরানকে বদলানোর যে নীতি প্রায় পাঁচ দশক ধরে অনুসরণ করা হয়েছে, তার সীমাবদ্ধতা আজ স্পষ্ট। কূটনীতি প্রয়োজন, কিন্তু সেটিও শুধু আলোচনার জন্য আলোচনা হলে চলবে না। সামরিক শক্তি প্রয়োজন, কিন্তু তারও সীমা আছে। অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর হতে পারে, তবে তাকে লক্ষ্য নয়, কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের খেলায় ইরানকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
এদিকে এই যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো ফাটল ততই চওড়া হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সন্দেহ বাড়ছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার নিচেও দেখা দিচ্ছে অনিশ্চয়তার ছায়া। তাই পুরনো মিত্রতার বাইরে নতুন আশ্রয় খুঁজছে তারা— চীন, রাশিয়া, তুরস্ক ও ইউরোপের দিকে বাড়ছে দৃষ্টি।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ভয় জ্বালানির পথ নিয়ে। হরমুজ বা লোহিতসাগর দীর্ঘদিন অচল থাকলে তেল-গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতির ভিতেও ফাটল ধরতে পারে।
অন্যদিকে ৪৭ বছরের পথ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পুরনো মানচিত্র আর পথ দেখাচ্ছে না। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, ব্যর্থ অবরোধ এবং থেমে থেমে চলা আলোচনার পর প্রশ্নটি এখন আর শুধু— কীভাবে ইরানকে আরও চাপ দেওয়া যায়, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এত চাপের পরও যখন প্রতিপক্ষ নুয়ে পড়ে না, তখন কি কৌশল বদলানোর সময় এসে যায় না?
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়







