দেউলিয়া শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সামলানো চিকিৎসক থেকে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর

ভোটকেন্দ্রে এল-সাইয়েদ। ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে পড়া ডেট্রয়েট শহরের বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন মাত্র ৩০ বছর বয়সে। ২০১৫ সালে শহরটির স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন আবদুল এল-সায়েদ। অর্থনৈতিক সংকটে যখন ডেট্রয়েটের সরকারি সেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপে, তখন শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। সেই জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবার মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার নজির গড়েছেন।
মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান
আবদুল এল-সায়েদের জন্ম ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, মিশিগানের রচেস্টার হিলসে। তার বাবা-মা দুজনই মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তাদের আদি বাড়ি দেশটির আলেকজান্দ্রিয়া শহরে। বাবা প্রকৌশলী ছিলেন। বাবার কাছেই বেড়ে ওঠেন এল-সায়েদ। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মিশিগানেই।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর মুসলিম পরিচয়ের কারণে তাকে নানা ধরনের বিদ্রূপ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং পরিচয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার পরামর্শ তাকে এসব পরিস্থিতি সামলাতে সহায়তা করে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়েছেন এল-সায়েদ। পরে রোডস বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। সেখান থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন ২০১১ সালে। এরপর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি নেন ২০১৪ সালে।
জনস্বাস্থ্য থেকে রাজনীতি
মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০১৫ সালে ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন এল-সায়েদ। এর দুই বছর আগে, ২০১৩ সালে দেউলিয়াত্বের আবেদন করেছিল শহরটি। অর্থনৈতিক সংকটে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্যসেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানোর কাজ করেন তিনি।
২০১৭ সালে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দেন এল-সায়েদ। পরের বছর মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চান। তবে দলীয় মনোনয়নযুদ্ধে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে হেরে যান। আট বছর পর সেই পরাজয় পেছনে ফেলে সিনেট নির্বাচনে জয় পেলেন তিনি।
২০২৩ সালে ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও সাবেক সেনাসদস্যদের কল্যাণ বিভাগের দায়িত্ব নেন এল-সায়েদ। তার নেতৃত্বে চিকিৎসার ঋণ কমাতে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের কর্মসূচি নেওয়া হয়। শিশুদের বিনা মূল্যে চশমা দেওয়া, বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ এবং স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগও ছিল এর অংশ।
ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন ও নির্বাচনী লড়াই
সিনেট নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে প্রথমে নিজ দলের ভেতরেই কঠিন লড়াই করতে হয়েছে এল-সায়েদকে। অবসর নিতে যাওয়া সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের লড়াইয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স। আগস্টের প্রাইমারিতে স্টিভেন্সকে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে হারিয়ে দলীয় মনোনয়ন পান তিনি।
সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসার ঋণ কমানো, ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপ এবং রাজনীতিতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল তার প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর প্রস্তাবের মধ্যে ছিল ‘মেডিকেয়ার ফর অল’—সব নাগরিকের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা।
ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও তার প্রচারের বড় বিষয় ছিল। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে তিনি গণহত্যা বলে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করে কূটনৈতিক আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
ট্রাম্পের আক্রমণ ও বিরোধিতা
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে আক্রমণ আরও তীব্র করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা। ট্রাম্প তাকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যা দেন। তার বিরুদ্ধে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলেন রিপাবলিকান নেতারা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এল-সায়েদও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
ট্রাম্প ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ও ফ্লাইট ৯৩-এর প্রসঙ্গ টেনে মিশিগানের ভোটারদের এল-সায়েদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। এমনকি সিনেটে ঢুকতে তাকে মেটাল ডিটেক্টর পার হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন। ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারে অংশ নেন।
এসব আক্রমণের জবাবে এল-সায়েদ বলেন, তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণকারীরা মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা—জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম—নিয়ে কোনো সমাধান দিতে পারছেন না। নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত রজার্সও ইরান যুদ্ধ ও কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসেন।
নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আরেকটি ধাক্কা আসে এল-সায়েদের জন্য। প্রাইমারিতে তাঁর কাছে হেরে যাওয়া হ্যালি স্টিভেন্স রজার্সকে সমর্থন জানান। এতে ডেমোক্রেটিক শিবিরে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন নিয়ে জয় পান এল-সায়েদ।
জয়ের বার্তা
জয়ের পর ডেট্রয়েটে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এল-সায়েদ বলেন, ‘আপনারা সবচেয়ে অসম্ভাব্য প্রার্থীর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা এমন একটি আমেরিকা চায়, যেখানে আমাদের কারও কারও জায়গা নেই। কিন্তু আমরা জানি, আমেরিকা আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট বড়।’
মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হওয়া এল-সায়েদের জন্য ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই বড় অর্জন। তার স্ত্রী সারা জুকাকু একজন মনোরোগ চিকিৎসক। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে। চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও রাজনীতিক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাচ্ছেন তিনি।



