আমেরিকায় ইতিহাস গড়লেন নারী ও সংখ্যালঘুরা
- ট্রাম্পবিরোধী ভোটে নতুন ইতিহাস
- ক্ষমতার শীর্ষে কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনা ও মুসলিম প্রতিনিধিরা

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে এবার অনেক হিসাবই বদলে গেল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের মধ্যেই ভোটাররা বেছে নিলেন নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাধিক প্রার্থীকে। কেউ হলেন প্রথম লাতিনা গভর্নর, কেউ দেশের প্রথম মুসলিম সেনেটর। আদিবাসী নারী থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে সমকামী প্রার্থী—জয় এসেছে তাঁদেরও। ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যেও জিতেছেন দলের প্রার্থীরা। ৪ নভেম্বর শিকাগো থেকে এই ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেছে রয়টার্স।
টেক্সাসের ফল এবার বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। সেখানে রিপাবলিকান গ্রেগ অ্যাবটকে হারিয়ে গভর্নর হয়েছেন ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। রাজ্যটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম লাতিনা গভর্নর। তাঁর জয়ের মধ্য দিয়ে গভর্নর পদে টানা ৩১ বছরের রিপাবলিকান আধিপত্যের অবসান হল। টেক্সাসের সেনেট নির্বাচনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট জেমস তালারিকো। হারিয়েছেন রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে। অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই টেক্সাসেই স্বচ্ছন্দে জিতেছিলেন ট্রাম্প। একই নির্বাচনে টেক্সাসের রেলরোড কমিশনের আসনে জয়ী হয়েছেন জন রোজেনথাল। জিউইশ হেরাল্ড-ভয়েসের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যব্যাপী কোনও নির্বাহী পদে নির্বাচিত প্রথম ইহুদি প্রার্থী তিনি।
মিশিগানেও ঘটেছে নজিরবিহীন ঘটনা। রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে প্রথম মুসলিম হিসেবে মার্কিন সেনেটে পৌঁছেছেন ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সায়েদ। নিউ মেক্সিকোয় প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হয়েছেন ডেব হালান্ড। জর্জিয়ায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন কেইশা ল্যান্স বটমস। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথম লাতিনো গভর্নর হয়েছেন জেভিয়ার বেসেরা। আর নিউ হ্যাম্পশায়ারে প্রথম প্রকাশ্যে সমকামী পুরুষ হিসেবে সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ক্রিস পাপাস।
তবে শুধু ডেমোক্র্যাট শিবিরেই এই পরিবর্তন দেখা যায়নি। ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান প্রার্থী বায়রন ডোনাল্ডসও ইতিহাস গড়েছেন। রাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
এই ফল নিয়ে মন্তব্য করেছেন জর্জিয়ার প্রাক্তন গভর্নর পদপ্রার্থী স্টেসি আব্রামস। তাঁর বক্তব্য, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ভোটাররা তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। এবার ডেমোক্র্যাটদের সাহসের সঙ্গে সরকার চালাতে হবে। দলের কৌশলবিদ বাকারি সেলার্সের সতর্কবার্তা, কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিক ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন স্থায়ী বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ না হলে এই ভোটাররা আবারও রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে পারেন।
কেন এই পরিবর্তন? বিশ্লেষকদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বাড়িভাড়া, স্বাস্থ্য পরিষেবা, খাবার ও জ্বালানির দাম বেড়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের শুল্কনীতি, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। এসব নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বেড়েছে। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জন গিয়ার মনে করেন, ২০২৪ সালে রিপাবলিকানরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার প্রায় কিছুই পূরণ হয়নি। এবারের ভোট সেই হতাশারই জবাব।
মিলওয়াকির নাগরিক সংগঠন ‘সোলস টু দ্য পোলস’-এর প্রধান গ্রেগ লুইসও ভোটারদের ক্ষোভের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে যখন সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ে, তখন তার প্রভাব ভোটেও দেখা যায়। তিনি নিজে উইসকনসিনের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেভিড ক্রাউলিকে ভোট দিয়েছেন। ক্রাউলি রাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর-নির্বাচিত হয়েছেন। টেক্সাসের বাসিন্দা জশুয়া আর্সের বক্তব্য, ভোটারদের সামনে গ্রহণযোগ্য নীতির বিকল্প তুলে ধরতে পারেনি রিপাবলিকান পার্টি।
তবে নির্বাচনে জয় মানেই সব বাধা কেটে যাওয়া নয়। নতুন প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন, সরকারি অর্থ বরাদ্দ কিংবা দলের নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নির্ভর করবে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোটের উপর। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাদিয়া ব্রাউনের আশঙ্কা, দলের প্রবীণ নেতৃত্বের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেসের কৃষ্ণাঙ্গ সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব ও কমিটিতে জায়গা পাওয়া নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের বেকারত্বের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান শুধু জনপ্রতিনিধির পরিচয় বদলে সম্ভব নয়। এতদিনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।



