ইনফ্লুয়েন্সার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
মার্কিনীদের মন ফেরাতে ইসরায়েলের নতুন প্রচারযুদ্ধ
- ইনফ্লুয়েন্সার, গির্জা, সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ ইসরায়েলের
- শত প্রচার সত্ত্বেও জরিপে ক্রমশ মুখ ফেরাচ্ছেন মার্কিন নাগরিকেরা

২০২৬ সালের বাজেটে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও জনকূটনীতির জন্য প্রায় ৭৩ কোটি ডলার রেখেছে ইসরায়েল।
যুদ্ধক্ষেত্র শুধু গাজা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নয়। আর একটি লড়াই চলছে মার্কিন নাগরিকদের মুঠোফোন, গির্জা, সংবাদমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর চ্যাটবটের পর্দায়। লক্ষ্য, ইসরায়েল সম্পর্কে দ্রুত বদলে যাওয়া আমেরিকার জনমত আবার নিজেদের পক্ষে আনা।
২০২৩ সালের পর আন্তর্জাতিক জনমত প্রভাবিত করতে ১০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে ইসরায়েল-কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের নতুন গবেষণায় এমন দাবি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি প্রতিনিধি নিবন্ধন আইনের আওতায় প্রকাশিত প্রভাব বিস্তারমূলক কার্যক্রমেই ব্যয় ১০ কোটি ডলারের বেশি। ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছর এই খাতে নিবন্ধিত ব্যয় প্রায় তিন গুণ হওয়ার পথে। তাতে বিদেশি সরকারগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত প্রভাবিত করার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হতে পারে ইসরায়েল।
২০২৬ সালের বাজেটে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও জনকূটনীতির জন্য প্রায় ৭৩ কোটি ডলার রেখেছে ইসরায়েল। আগের বছরের বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি ডলার। গাজায় যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায়েএই পরিমাণ প্রায় ২০ গুণ। ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সারের ভাষায়, মানুষের ‘মন ও হৃদয়’ জয়ের জন্য যুদ্ধ–বিমান, বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মতোই এখাতেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
প্রচারের কেন্দ্রে ইনফ্লুয়েন্সার
দীর্ঘদিন মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রধান ভরসা ছিল আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকসহ দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংগঠন, দাতা ও রাজনৈতিক মিত্র। এখন সেই পুরোনো কাঠামোর পাশাপাশি সরাসরি নিয়োগ করা হচ্ছে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করতে বিদেশি প্রতিনিধি হিসেবে নিবন্ধন করেছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে বড় চুক্তিটি পেয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রচারকৌশলী ব্র্যাড পারস্কেলের প্রতিষ্ঠান ক্লক টাওয়ার এক্স। চুক্তির মূল্য চার কোটি ৬৫ লাখ ডলার।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনের দাবি, প্রায় দুই লাখ অনুসারীর একটি ইনস্টাগ্রাম হিসাব পরিচালনাকারী ইয়োভ ডেভিসকে এক লাখ ৬১ হাজার ডলার দিয়েছে ইসরায়েল সরকার। আরও এক ডজনের বেশি ইনফ্লুয়েন্সারের মাধ্যমে ইসরায়েলপন্থী প্রচার চালাতে ব্রিজেস পার্টনার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় নয় লাখ ডলারের চুক্তি।
মার্কিন বিচার দপ্তরে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, ‘এস্থার প্রকল্প’ নামে পরিচিত এই প্রচারাভিযান ২০২৫ সালের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চালানোর কথা ছিল। ব্রিজেস পার্টনার্স ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে হাভাস মিডিয়া গ্রুপের অধীনে কাজ করেছে। তবে ১৪ থেকে ১৮ জন সংশ্লিষ্ট ইনফ্লুয়েন্সার বিদেশি প্রতিনিধি হিসেবে নিবন্ধন করেননি–এই অভিযোগে বিচার দপ্তরে আনুষ্ঠানিক নালিশ জানিয়েছে নাগরিক অধিকার সংগঠন পাবলিক সিটিজেন। অভিযোগটির বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তের তথ্য এখনও নেই।
ইনফ্লুয়েন্সার ব্যবহারের সুবিধা হলো সরকারি প্রচারও ব্যক্তিগত মতামত বা জীবনযাপনবিষয়ক সাধারণ বিষয়বস্তুর মতো দর্শকের সামনে হাজির করা যায়। ফলে কে অর্থ দিচ্ছে কিংবা বার্তাটির পেছনে কার স্বার্থ রয়েছে, তা সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে সব সময় স্পষ্ট হয় না।
গির্জায় গেলেও পিছু নিচ্ছে বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের নতুন প্রচারকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য তরুণ মার্কিন নাগরিক, রক্ষণশীল ভোটার ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা। ফরাসি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান হাভাস মিডিয়া ২০২৪ সাল থেকে অন্তত সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে এই কাজে যুক্ত করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে প্রচার চালাতে ৩২ লাখ ডলারের একটি চুক্তি হয়। এতে অবস্থান শনাক্তকারী প্রযুক্তির মাধ্যমে গির্জায় যাওয়া মানুষের মুঠোফোনে ইসরায়েলপন্থী বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ব্যবহারকারীর অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট এলাকা ও শ্রেণির মানুষের জন্য আলাদা বার্তা তৈরিই ছিল এই কৌশলের ভিত্তি।
ইসরায়েলের ২০২৫ সালের প্রচার ব্যয়ের একটি অংশের হিসাবও প্রকাশ্যে এসেছে। গুগল, ইউটিউব, এক্স এবং অন্যান্য মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি ডলার; রাজনীতিক, ধর্মযাজক, ইনফ্লুয়েন্সার ও বিশ্ববিদ্যালয়প্রধানসহ ৪০০ বিদেশি প্রতিনিধিদলকে ইসরায়েল সফরে নেওয়ার জন্য প্রায় চার কোটি ডলার ব্যয় করেছে দেশটি। পাশাপাশি ২৫০টি সংবাদমাধ্যম এবং প্রতিদিন ইসরায়েলবিষয়ক প্রায় ১০ হাজার প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষ গণমাধ্যমকেন্দ্র।
চ্যাটবটের উত্তরও বদলানোর চেষ্টা
নতুন এই প্রচারযুদ্ধের সবচেয়ে আলোচিত দিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রকাশিত নথির ভিত্তিতে দ্য নিউ আরবের দাবি, ইসরায়েলপন্থী বিবরণ ছড়িয়ে দিতে বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট ও অনলাইন নিবন্ধ তৈরির কাজ করছে ক্লক টাওয়ার এক্স।
এসব লেখা ভবিষ্যতে বৃহৎ ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণের তথ্যভান্ডারে ঢুকে পড়তে পারে। উদ্দেশ্য, ইসরায়েল, গাজা ও ফিলিস্তিন সম্পর্কে প্রশ্ন করলে চ্যাটবটের উত্তরে ইসরায়েলের অবস্থানকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। প্রায় এক হাজার ওয়েবসাইট, শত শত নিবন্ধ এবং গণহারে বার্তা পাঠানোর ব্যবস্থাও এই কার্যক্রমের অংশ বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। তবে নির্দিষ্ট কোনো চ্যাটবটের উত্তর ইতিমধ্যে বদলে গেছে–এমন কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
এত খরচেও ফিরছে না সমর্থন
বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের পতন থামেনি। এপ্রিলের একটি জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন; ইতিবাচক মত ছিল ৩৭ শতাংশের। এক বছরের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব বেড়েছে সাত শতাংশ। ৫০ বছরের কম বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যেও ৫৭ শতাংশের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক।
আরেক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। গ্যালাপের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল মার্কিনির সংখ্যা বেশি। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ৪১ শতাংশ, ইসরায়েলিদের পক্ষে ৩৬ শতাংশ।
এই পরিবর্তনের ছাপ মার্কিন কংগ্রেসেও। চলতি বছরের এপ্রিলে সিনেটের ৪৭ ডেমোক্র্যাট সদস্যের মধ্যে ৪০ জন ইসরায়েলের কাছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বুলডোজার বিক্রি ঠেকানোর পক্ষে ভোট দেন। এক হাজার পাউন্ডের বোমা বিক্রির বিরোধিতা করেন ৩৬ জন। এটি ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধে কংগ্রেসে এ পর্যন্ত নেয়া সবচেয়ে বড় প্রতিবাদগুলোর একটি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনও এই বিরূপ মনোভাবের জন্য দায়ী; শুধু প্রচারের দুর্বলতাকে দায়ী করা ঠিক নয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল ইসরায়েল বাচারের মতে, সমস্যাটির কোনো সহজ সমাধান নেই। বিজ্ঞাপন ও ইনফ্লুয়েন্সারের পাশাপাশি চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানেও ইসরায়েলের বক্তব্য তুলে ধরার পক্ষে তিনি।
তবে জনমত বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের মূল্যায়ন ভিন্ন। তাদের মতে, গাজা ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নীতি না বদলালে শুধু বিজ্ঞাপন, ইনফ্লুয়েন্সার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন। অর্থ দিয়ে বার্তার পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ছবিকে অদৃশ্য করা সম্ভব নয়।




